পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের পরিস্থিতি এখন ছুরির ধারের উপর দাঁড়িয়ে। গত তিন বছর ধরে গড়ে ওঠা এবং এখন বিপ্লবী মাত্রায় পৌঁছে যাওয়া গণআন্দোলন সচল হয়ে উঠেছে। আন্দোলন যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই বেড়েছে তার দাবিদাওয়া। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আন্দোলন কাশ্মীরের কর্তৃপক্ষ ও পাকিস্তান সরকারের দিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
[মূল প্রবন্ধঃ The stark fate of Kashmir]
শুরুতে দাবিগুলো আবর্তিত হচ্ছিল গম ও বিদ্যুতের ভর্তুকি পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে, কিন্তু এখন তার সঙ্গে কর্মসংস্থান ও গণতান্ত্রিক অধিকারের মতো অন্যান্য সামাজিক প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে। যুব বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের দ্বিগুণ হওয়ায় সংগ্রামের সামনের সারিতে রয়েছে তরুণরা, আর তাদের পাশাপাশি রয়েছেন নারীরা—যাঁরা সবচেয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।
কেন্দ্রীয় সরকার তার দিক থেকে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে এই আন্দোলনকে রক্তে ডুবিয়ে দমন করাই তাদের অভিপ্রায়। এর ফলে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন—যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণহানি।
শাসকশ্রেণি বুঝতে পারছে, তথাকথিত 'আজাদ' কাশ্মীরের এই গণঅভ্যুত্থান আসলে গত দুই বছরে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালজুড়ে বয়ে যাওয়া বিপ্লবী গণআলোড়নেরই ধারাবাহিকতা। এ ধরনের বিপ্লবী গণবিস্ফোরণ তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
কাশ্মীরের আন্দোলন এ বছরের জুনের শুরুতে আবারও জ্বলে ওঠে—গণবিক্ষোভ, মিছিল ও ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে, যা গোটা অঞ্চলকে অচল করে দিয়েছে। সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্যদের প্রবেশ ঠেকাতে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় ব্যারিকেড গড়ে তুলেছে। এগুলোই হলো গড়ে ওঠা দ্বৈত ক্ষমতার (dual power) উপাদান।
ফিনান্সিয়াল টাইমস প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “পাকিস্তান সরকার এ অঞ্চলটিতে তার কর্তৃত্বের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এই গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (JAAC), যাকে পাকিস্তান রাষ্ট্র 'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দমনের চেষ্টায় এর জেরে শুরু হয়েছে ধরপাকড় এবং বহু কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরিস্থিতি চাপা দিতে মরিয়া কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়েছে। পুলিশ ও আধাসামরিক রেঞ্জার্স তাদের নৃশংস দমননীতি জোরদার করেছে, নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের জমায়েতে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে—যার ফলে বহু মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।
এরপর কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার লক্ষ্যে ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এতেও আন্দোলন দমানো যায়নি।
এর জবাবে JAAC নেতাদের ঘোষিত, অঞ্চলটির রাজধানী মুজাফফরাবাদ অভিমুখে লং মার্চ বিভিন্ন শহর ও এলাকা থেকে গতি সঞ্চয় করতে থাকে; লক্ষ্য ছিল রাওয়ালাকোটের উপকণ্ঠে জমায়েত হওয়া—যা রাজধানী অভিমুখে যাত্রার ঘাঁটি হিসেবে কাজ করবে। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল রাওয়ালাকোটে প্রবেশ করা, কিন্তু শহরে ঢোকার পথ আটকে রেখেছিল দখলদার নিরাপত্তা বাহিনী।
রক্তপাত ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপস্থিতির কারণে রাওয়ালাকোটে প্রবেশ নিয়ে ব্যাপক দোদুল্যমানতা ও গড়িমসি দেখা যায়। এই সতর্কতা বিশেষভাবে প্রকট ছিল নেতৃত্বের মধ্যেই। কিন্তু তৃণমূল থেকে আসা ক্রমবর্ধমান চাপ—বিশেষত নারীদের চাপ—নেতৃত্বকে শহর অভিমুখে মিছিলের ঘোষণা দিতে বাধ্য করে। শহরে ঢুকে তারা প্রতিরোধের একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি (Bridgehead) গড়ে তোলে, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে হটিয়ে দেওয়া যায়।
তবে রেঞ্জার্স শক্তি প্রয়োগ করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল, নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে হত্যা ও আহত করে। কাশ্মীরের অন্যান্য এলাকার শহরগুলোও একই সঙ্গে সচল হয়ে উঠেছিল, কিন্তু সেখানেও পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী হামলা চালায়।
আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি
প্রথম আওয়ামী অ্যাকশন কমিটিগুলো গড়ে ওঠে আমাদের পাকিস্তানি কমরেডদের—ইনকিলাবি কমিউনিস্ট পার্টির (RCP)—উদ্যোগে। মার্ক্সবাদীদের এই উদ্যোগ ও আহ্বান আন্দোলনের সাংগঠনিক প্রকাশ পাওয়ার প্রয়োজনের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ফলে যেসব শহর ও গ্রামে মার্ক্সবাদীদের উপস্থিতি ছিল, কমিটিগুলো তার সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং ২০২৩ সালের শরৎকালে এই কমিটিগুলোর একত্রীকরণের মধ্য দিয়ে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি গঠনে তা পরিণতি লাভ করে।
দুই বছর পর, ২০২৫ সালের শেষদিকে, ৩৮ দফা দাবিনামার সমর্থনে এই কমিটির শাটডাউন ও ধর্মঘটের কর্মসূচি গোটা অঞ্চলকে অচল করে দিয়েছিলো। চাপের মুখে কর্তৃপক্ষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মূল প্রস্তাবগুলো মেনে নেয়, সঙ্গে সঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে সব দাবির সুরাহা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়।
এটি যে গণআন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি কৌশল ছিল এবং ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার উপায়-তা স্পষ্ট।কর্তৃপক্ষের এই বিশ্বাসঘাতকতাই, যেখানে তারা সম্মত দাবিগুলোর একটিও বাস্তবায়ন করতে অস্বীকার করে, বর্তমান পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
এর জবাবে JAAC তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিক মিছিলের ঘোষণা দেয়। সংগঠিত হওয়ার এই আহ্বান নিপীড়িত জনসাধারণ দুর্দান্ত সাহসিকতার এক অনন্য প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে সোৎসাহে গ্রহণ করে। একইভাবে, RCP-র আমাদের কমরেডরাও প্রতিটি পর্যায়ে সামনে এগোনোর পথ ব্যাখ্যা করে নিজেদের কর্তব্য পালন করেছেন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কমিটি গঠনের সূচনা করা সত্ত্বেও, আকারে ছোট হওয়ার কারণে আমরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারিনি—যদিও রাওয়ালাকোট অ্যাকশন কমিটিতে আমাদের প্রভাব ক্রমশ বেড়েছে। তবে আমরা জানি, শূন্যতা প্রকৃতির অসহ্য।
ফলস্বরূপ, JAAC-র নেতৃত্ব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিপ্লবীদের হাতে নয়, বরং আকস্মিকভাবে উঠে আসা কিছু উপাদান—আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেটি-বুর্জোয়া স্তরের-হাতে গিয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত, এই স্তরগুলোর কাছে আন্দোলনের জন্য কোনো স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। আমাদের কমরেডরা যখন প্রথম রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো তোলেন, তখন এই নেতারা তাঁদের বলেন- নৌকা দোলাবেন না, আন্দোলনের 'ঐক্য রক্ষার' স্বার্থে রাজনীতিকে এর বাইরে রাখতে হবে।
এ ধরনের মানুষের কাছ থেকে এমন যুক্তি আমরা বহুবার শুনেছি। 'ঐক্যের' ধুয়া তোলা হয় আন্দোলনের মুখ বন্ধ করার অজুহাত হিসেবে এবং আলোচনাকে ভোঁতা করে দেওয়ার প্রয়াস হিসেবে। সর্বোপরি, এটি বিপ্লবী ধ্যানধারণাকে স্তব্ধ করার একটি ব্যবস্থা—যাকে তারা নিজেদের কর্তৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখে। কিন্তু আমাদের কমরেডরা, যাঁরা শুরু থেকে এই আন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন, তাঁদের স্তব্ধ হওয়ার পাত্র নয়।
তাই আমাদের কমরেডরা এই ধারণা সামনে এনেছেন যে, অ্যাকশন কমিটিগুলোকে কেবল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না—যে ছাড় থেকে কর্তৃপক্ষ সবসময়ই পিছু হটে যায়—বরং সামনে এগোনোর একমাত্র বাস্তব পথ হলো জনগণের নিজেদের হাতে ক্ষমতা গ্রহণ।
'আজাদ' কাশ্মীরে জনগণের অবস্থা নাভিশ্বাস। এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষি, উদ্যানপালন, পর্যটন ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পনির্ভর এবং এটি পাকিস্তানের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে কার্যত কোনো শিল্প-শ্রমিক না থাকলেও, নিপীড়িত জনসাধারণের মধ্যে বঞ্চনার এক জ্বলন্ত অগ্নি-অনুভূতিতে রয়েছে। তাই তারা যেকোনো মূল্যে একটা উত্তরণের পথ খুঁজছে।
এই অঞ্চলে যে শ্রমিকরা আছেন, তাঁরা প্রধানত জলবিদ্যুৎ ও সরকারি খাত—মূলত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে—কেন্দ্র করে অবস্থান করছেন। 'আজাদ' জম্মু ও কাশ্মীর বর্তমানে প্রায় ২,৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যার মূল উৎস মাঙ্গলা ড্যাম রেইজিং প্রকল্প এবং নীলম-ঝিলাম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। বেশ কয়েকটি বড় সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্প চলমান রয়েছে, যেগুলোর পেছনে মূলত চীনা ঋণের সমর্থন রয়েছে এবং যেগুলো উৎপাদন আরও বাড়াবে। এই অঞ্চলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চলে যায় পাকিস্তানের জাতীয় গ্রিডে, অথচ স্থানীয় ব্যবহার মাত্র ৪০০ মেগাওয়াটের মতো—অঞ্চলটিতে উৎপাদিত বিদ্যুতের সিংহভাগ পাকিস্তানে চলে যাওয়ার এই বাস্তবতাই আঞ্চলিক ইউটিলিটি মূল্যনির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ও বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে জলবিদ্যুৎকে পরিণত করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে এগোতে হবে, লেনিন তা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে, যখন তিনি জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নের কর্তব্য নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেছিলেন, বিপ্লবী সংগ্রামে ঔপনিবেশিক ও প্রাক্তন ঔপনিবেশিক দেশগুলোর কমিউনিস্টদের জন্য নিপীড়িত স্তরগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করা প্রয়োজন। এই সংগ্রামে "কৃষক সোভিয়েত বা শ্রমজীবী মানুষের সোভিয়েতের পক্ষে প্রচার চালানো" ছিল তাঁদের কর্তব্য।
এ ধরনের অ্যাকশন কমিটি সফলভাবে গড়ে তোলার পর পরবর্তী পদক্ষেপ হলো এমন একটি কর্মসূচি হাজির করা যা সামনের পথ নির্দেশ করবে—প্রাথমিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবি দিয়ে শুরু করে সেগুলোকে ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করবে। সকলের কাছেই স্পষ্ট যে, কাশ্মীরের গণআন্দোলন একটি বিপ্লবী আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে, যা প্রাথমিক দাবিদাওয়াকে বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে। যতই দিন যাচ্ছে, ততই জনসাধারণ নিজেদের শক্তি অনুভব করতে পারছে।
আবারও, ১৯০৫ সালে লেনিনই সদ্যগঠিত শ্রমিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতকে দেশের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং বৈধ "বিপ্লবী অস্থায়ী সরকার" হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ বলশেভিকরা তখন সংখ্যালঘু ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা শুরুতে সেন্ট পিটার্সবার্গ সোভিয়েতের প্রতি একটি সাম্প্রদায়িক-গোষ্ঠীবাদী (sectarian) দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন, যা লেনিন সংশোধন করতে বাধ্য হন। ট্রটস্কি, যিনি সোভিয়েতের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, লেনিনের মতোই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
গাজর ও লাঠি
আন্দোলনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ঘাড়ে অনুভব করে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ JAAC-র বিরুদ্ধে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' বলে কুৎসা রটায় এবং মিথ্যা অভিযোগ তোলে যে ভারত এর অর্থায়ন করছে। এর জেরে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু এই পদক্ষেপ আন্দোলনকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে এবং আরও বড় করে দেয়।
শাসকগোষ্ঠী উদ্বিগ্ন যে কাশ্মীরের অস্থিরতা আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। বস্তুত, নানা অর্থেই কাশ্মীর হলো খোদ পাকিস্তানেরই ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি—পাঞ্জাব থেকে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া পর্যন্ত দেশের বহু অংশ ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা ও ক্ষোভে আচ্ছন্ন। ইরান যুদ্ধের চাপ ও আইএমএফ-এর ফরমানের নিচে অর্থনীতি যতই ভেঙে পড়ছে, ততই বেশিরভাগ মানুষ চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধায় ভুগছে, এবং তা দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।
জনসাধারণের চোখে পাকিস্তান সরকার ক্রমশ বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে এবং দেশটি বসে আছে এক বারুদের স্তূপের ওপর।
আন্দোলনকে কেটে ফেলার চেষ্টায় পাকিস্তান সরকার 'আজাদ' কাশ্মীরের আইনসভার জন্য দফায় দফায় নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু কাশ্মীরি জনসাধারণ বুঝে গিয়েছিল যে 'সংরক্ষিত আসন' সমেত এই নির্বাচনগুলো স্পষ্টতই কারচুপির—ইসলামাবাদের অনুকূল একটি সরকার নিশ্চিত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
এসব পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন একটি প্রহসন মাত্র। জনসাধারণ যথার্থই তা বর্জন করেছে। পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত সব রাজনৈতিক দল ক্ষমতার লুটের ভাগ পাওয়ার আশায় এতে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এতে জনসাধারণের চোখে তাদের বৈধতার অভাবই আরও প্রকট হয়েছে। বর্জনের কারণে ভোটকেন্দ্রগুলো প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকলেও হাজার হাজার ভুয়া 'ভোট' দেখিয়ে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
তবে যেমনটা প্রত্যাশিত, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ লাঠির পাশাপাশি গাজরও ব্যবহার করে আসছে। নিজেদের ও JAAC নেতাদের মধ্যে গোপন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কোনো একধরনের সমাধানে পৌঁছে অ্যাকশন কমিটিতে ভাঙন ধরানোর চেষ্টায় তারা ব্যস্ত রয়েছে। আইনজীবী ও এনজিও কর্মীরা দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন। ২৮ জুলাইয়ের সর্বশেষ রক্তক্ষয়ের আগে JAAC নেতা উমর নাজির কাশ্মীরি এই আলোচনায় জড়িত ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন আপাতত এই প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়েছে।
অ্যাকশন কমিটির নেতারা প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্বিধা করেছেন ও গড়িমসি করেছেন, শেষমেশ গণআন্দোলনের চাপেই কেবল সামনে এগিয়েছেন। এটা স্পষ্ট যে বর্তমান নেতৃত্ব সংকট নিরসনে একটি শান্তিপূর্ণ আপসরফা খুঁজছে। তাঁদের অবস্থা সেই মানুষটির মতো, যে কিনা বাঘের পেটে না গিয়ে, ক্ষুধার্ত বাঘের পিঠ থেকে নামতে মরিয়া হয়ে আছে।
কিন্তু আন্দোলন এখন মোড়ের মুখে দাঁড়িয়ে। জনসাধারণ জেগে উঠেছে এবং লড়াইয়ের জন্য উন্মুখ। আন্দোলনের যেকোনো পশ্চাদপসরণ দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবেই দেখা হবে। আর দুর্বলতা আগ্রাসনকে ডেকে আনে।
আমাদের কমরেডরা ধারাবাহিকভাবে যুক্তি দিয়ে এসেছেন যে লং মার্চের লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজধানী দখল করা, পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা এবং একটি গণবিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এটাই যে জনসাধারণের অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা, তা স্পষ্ট। তবে এর অর্থ হলো কেবল আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষকে নয়, খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রকেই চ্যালেঞ্জ জানানো। এটি অবশ্যই একটি অত্যন্ত গুরুতর পদক্ষেপ।
স্বল্পকালীন কিছু বিরতি ছাড়া সেনাবাহিনীই সবসময় পাকিস্তানে আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে। শীর্ষ জেনারেলরা এখন কী করণীয় তা নিয়ে আলোচনা করছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, একমাত্র করণীয় হলো আন্দোলনকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে জনসাধারণকে উচিত শিক্ষা দেওয়া। এটাই তাঁদের চিরাচরিত পন্থা।
পুলিশ ও রেঞ্জার্সের হাতে বিক্ষোভকারীদের গুলিবিদ্ধ হওয়া নিছকই পূর্বাভাস মাত্র। এ থেকে বোঝা যায়, আন্দোলন দমনে তারা কতদূর যেতে প্রস্তুত। তবু জনসাধারণ সচল হয়ে উঠেছে। তারা কোনো ভয় দেখাচ্ছে না। তারা সাহসের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের কাজ পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করা নয় যে তারা একটি 'শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের' প্রতিনিধিত্ব করছে—যে দাবি ইসলামাবাদ উড়িয়েই দেয়—বরং আত্মরক্ষার পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকা।
সব মহান বিপ্লবী আন্দোলনের মতোই, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মুখোমুখি হলে আত্মরক্ষার আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এর অর্থ যে উপায়েই হোক অস্ত্র সংগ্রহ করা। এটা করা গেলে পুলিশ ও রেঞ্জার্স যথেষ্ট দ্রুতই পালিয়ে যাবে। নিরস্ত্র নারী-পুরুষ-শিশুর ওপর গুলি চালানোর সময় তারা বীর, কিন্তু সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হলে ততটাই কাপুরুষ।
ক্ষমতার সংগ্রাম অবশ্যই একটি অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মনে হচ্ছে JAAC নেতাদের প্রয়োজনীয় ইচ্ছাশক্তির অভাব রয়েছে। জনসাধারণের উগ্রতার তুলনায় তাঁরা ভীরু এবং ক্ষমতা গ্রহণের কোনো বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের নেই। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণই সাফল্যের একমাত্র পথ।
সৎভাবে বলতে গেলে, এই পরিস্থিতিতে যার অভাব তা হলো একটি বিপ্লবী নেতৃত্ব ও পার্টি। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও একই অবস্থা ছিল। এসব ক্ষেত্রে বিপ্লবী জনসাধারণ সচল হয়ে উঠেছিল, কিন্তু নেতৃত্ব আপস করতে ছিল অতিমাত্রায় আগ্রহী—আর এটাই শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজয়ের কারণ হয়েছিল।
জনসাধারণের শক্তি অনর্থক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষমতা আক্ষরিক অর্থেই তাদের হাতের মুঠোয় ছিল। রাষ্ট্রের দমনমূলক বাহিনীগুলোকে ঝেঁটিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নেতারা আপস খুঁজলেন এবং কেবল শীর্ষে কিছু মুখ বদল হওয়াতেই সন্তুষ্ট থাকলেন। সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল, ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ হারিয়ে গেল। কাশ্মীরের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
উপমহাদেশজুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য !
এমন এক গণআন্দোলনে আরামকেদারায় বসা সম্প্রদায়গুলোর মতো পাশে দাঁড়িয়ে দেখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের কমরেডরা তাঁদের কর্তব্য পালন করছেন। প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের কাজ সত্য বলা এবং সামনে এগোনোর পথ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা—যা তাঁরা করেই চলেছেন। কাশ্মীরে জ্বলন্ত জাতীয় প্রশ্নটি সামাজিক প্রশ্নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সামাজিক মুক্তি ছাড়া জাতীয় মুক্তি হতে পারে না। আর ইসলামাবাদ ও দিল্লিতে শাসক অভিজাতরা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জাতীয় মুক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়।
সন্দেহ নেই, কাশ্মীরে জনসাধারণের ক্ষমতা গ্রহণ বিপ্লবী আন্দোলনকে দমন করার লক্ষ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ডেকে আনবে। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। এর মোকাবিলার একমাত্র উপায় হলো সেনাবাহিনীর সাধারণ সারির সৈনিকদের কাছে শ্রেণিগত আবেদন জানানো—যাঁদের অনেকেই কাশ্মীরি এবং যাঁরা বিপ্লবী প্রচারণার প্রতি উন্মুক্ত থাকবেন।
সাম্রাজ্যবাদীরা বলশেভিক বিপ্লব দমন করতে ২১টি বিদেশি হস্তক্ষেপকারী সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদীদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও সোভিয়েত সরকারের পক্ষ থেকে সৈন্যদের কাছে শ্রেণিগত আবেদন এবং পশ্চিমের শ্রমিকদের সংহতির কারণে তারা পরাজিত হয়েছিল।
কাশ্মীরের বিপ্লবকে অবশ্যই একটি আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে হবে। ক্ষমতা গ্রহণের পর পাকিস্তানের শ্রমজীবী জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানাতে হবে যেন তারা এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এবং ভূস্বামীতন্ত্র ও পুঁজিবাদের দুর্দশার অবসান ঘটায়। আইএমএফ-এর দাবির চাপে চাপিয়ে দেওয়া দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ও পরিবহন খরচের ঊর্ধ্বগতির ভারে পাকিস্তানের জনসাধারণ ফুঁসছে। প্রকৃত নেতৃত্ব দেওয়া হলে তারা সাড়া দেবে।
একইভাবে ভারতেও শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ব্যাপক অসন্তোষ বিদ্যমান, যা ককরোচ পার্টির বিস্তার থেকেই প্রমাণিত। এটি ছিল দেশটির ভেতরকার প্রকৃত বিস্ফোরক পরিস্থিতিরই একটি লক্ষণ। আবারও বলি, ভারতীয় জনসাধারণের প্রতি একটি বিপ্লবী আহ্বান তৎক্ষণাৎ সাড়া জাগাতে পারে। এর চেয়ে ভালো সময় আর কখনও আসেনি।
অন্য কথায়, কাশ্মীরের ভাগ্য ও তার জাতীয় মুক্তি সরাসরি জড়িত ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সঙ্গে।
এ কারণেই আমাদের কমরেডরা কাশ্মীরে RCP গড়ে তুলতে জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছেন—ঠিক যেমনটি লেনিন ১৯০৫ সালের বিপ্লবী উত্তালতার মধ্যেও পার্টি ক্যাডারদের করতে তাগিদ দিয়েছিলেন।
তবে JAAC যদি ভবিষ্যতে কিছু ছাড় পাওয়ার বিনিময়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করে, তা হবে একটি ফাঁদ। ইসলামাবাদের চক্রটি আগের মতোই এটিকে ব্যবহার করবে আন্দোলনকে ধোঁকা দিতে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনসাধারণকে একবার নিষ্ক্রিয় করে ফেলা গেলে পাকিস্তান রাষ্ট্র লৌহমুষ্টি নিয়ে আঘাত হানবে আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে। তারা প্রতিশোধ চাইবে। সাধ্যে কুলালে তারা গণআন্দোলনকে আর কখনও মাথা তুলতে দেবে না।
তাই যে অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, সে সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করতেই হবে। এই পরিস্থিতিতে আপসের পথ হবে পরাজয় ও আরও রক্তপাতের পথ। বিজয়ের একমাত্র পথ হলো কাশ্মীরে জনসাধারণের ক্ষমতা গ্রহণ এবং দাবানলের মতো গোটা ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নিহিত রয়েছে কাশ্মীরের জনসাধারণের কঠিন নিয়তি।




