বিপ্লবী কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের ইশতেহার Share Tweet১৯৩৮ সালে মহান রুশ বিপ্লবী ও সোভিয়েত রাজনীতিবিদ লিওন ট্রটস্কি বলেছিলেন “মানবজাতির ঐতিহাসিক সংকট আজ মূলত পরিনিত হয়েছে বিপ্লবী নেতৃত্বের সংকটে”। এই শব্দগুলি আজও ততটাই সত্য ও প্রাসঙ্গিক রয়েছে, যতটানা ছিল এই শব্দগুলির লিখার দিন।একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আজ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নিজেকে অস্তিত্বের সংকটে খুঁজে পেয়েছে। ইতিহাসের পাতায় এমন পরিস্থিতি মোটেও অস্বাভাবিক নয়। এটি কেবল এই সত্যেরই বহিঃপ্রকাশ যে, একটি নির্দিষ্ট সমাজ-ঐতিহাসিক ব্যবস্থা তার বিকাশের সীমা স্পর্শ করেছে এবং প্রগতিশীল কোনো ভূমিকা পালনে সে আর সক্ষম নয়।ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মার্কসীয় তত্ত্ব আমাদের এই ঘটনার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। সকল সামাজিক-ঐতিহাসিক ব্যবস্থার উত্থন হয় কিছু নির্দিষ্ট কারনে। তারা বিকশিত হয়, সমৃদ্ধ হয়, তার শিখরে পৌঁছায়, এবং শেষ পর্যন্ত পতনের ধাপে প্রবেশ করে। দাস সমাজ এবং রোমান সাম্রাজ্যের পতন, উভয় ক্ষেত্রেই আমরা এই সত্য দেখেছি।তার সময়ে পুঁজিবাদ শিল্প, কৃষি, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল যা অতীতে ছিল কল্পনাতীত। আর তা করতে গিয়ে অজান্তেই পুঁজিবাদীরা ভবিষ্যতের এক শ্রেণীহীন সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত ভিত্তি তৈরি করে ফেলেছে।আজ এই পুজিবাদি ব্যবস্থা তার সীমায় পৌঁছেছে এবং তার পূর্বের প্রগতিশীল ভূমিকা আজ বিপরীতে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বহুকাল আগেই তার ঐতিহাসিক সম্ভাবনা নিঃশেষ করে ফেলেছে। সমাজকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে এটি আজ এমন এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে আর ফেরার পথ নেই।বর্তমান সংকট পুঁজিবাদের সাধারণ চক্রাকার সংকটে আর নেই। এই সংকট আজ পুরো পুঁজিবাদের অস্তিত্তের সংকটে পরিনিত হয়েছে যা শুধু প্রকাশ পাচ্ছে উৎপাদক শক্তির স্তবিরতাতে নয়, বরং সংস্কৃতি, নৈতিকতা, রাজনীতি, ও ধর্মের গভীর সংকটে।ধনী ও দরিদ্রের মাঝে যে বিশাল গহ্বর—একদিকে হাতে গোনা কিছু পরগাছার কাছে অশ্লীল সম্পদের পাহাড়, আর অন্যদিকে মানবজাতির বিশাল অংশের জন্য দারিদ্র্য, নিঃস্বতা আর হতাশা—তা আগে কখনোই এত প্রকট ছিল না।এগুলি হলো এমন এক অসুস্থ সমাজের বীভৎস লক্ষণ যা উচ্ছেদের জন্য পেকে পচে গেছে। এর চুড়ান্ত পতন অনিবার্য এবং তা এড়ানো অসম্ভব। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সংকট বিলম্বিত করার বা অন্তত সাময়িকভাবে এর প্রভাব কিছুটা প্রশমিত করার মতো কোনো হাতিয়ার ধনীদের কাছে নেই।তবে, তাদের সেই পদক্ষেপগুলি শুধু নতুন এবং সমাধান-অসাধ্য সংকটের জন্ম দেয়। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট ছিল একটি বড় বাঁকবদল। সত্যটি এই যে, বিশ্ব পুঁজিবাদ সেই সংকট থেকে এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।দশকের পর দশক ধরে, বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরা আমাদের যুক্তি দেখিয়ে এসেছে যে ‘বাজারের অদৃশ্য হাত’ (invisible hand of the market) সব সমস্যার সমাধান করবে এবং জাতির অর্থনৈতিক জীবনে সরকারের কোনো ভূমিকাই থাকা উচিত নয়। কিন্তু বাজার ধসের সময় সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই তারা রক্ষা পেয়েছিল। সেই সংকটের সময়, বিশ্বের বুর্জোয়া সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ বিপর্যয় এড়াতে তাদের গড়া ব্যবস্থার ভেতরে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালতে বাধ্য হয়েছিল।বুর্জোয়ারা কেবল তাদের বেবস্থাকে তার সাধারণ সীমার থেকে বহু দূরে ঠেলার মাধ্যমে এটিকে রক্ষা করতে সফল হয়েছিল। বিশ্বের সরকারগুলো তাদের বেবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে এমন বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে যা তাদের ছিল না। এবং কোভিড-১৯ মহামারীর সময়েও এই একই বেপরোয়া পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল।এই মরিয়া পদক্ষেপগুলো অনিবার্যভাবে মুদ্রাস্ফীতির এক অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ এবং বিশাল সরকারি, কর্পোরেট ও ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা তৈরি করেছে, যা সরকারগুলোকে এখন অর্থনীতির রাশ টেনে ধরতে বাধ্য করেছে। এখন পুরো প্রক্রিয়াটিকে সরকারগুলো উল্টো দিকে ঘুরাচ্ছে।অস্বাভাবিক নিম্ন সুদের হার এবং সহজ ঋণের যুগ এখন কেবলই অতীতের এক ম্লান স্মৃতি। অদূর ভবিষ্যতে—কিংবা আদৌ কখনও—আমরা যে সেই পূর্ববর্তী সময়ে ফিরে যাব, তার কোনো সম্ভাবনা নেই।বিশ্ব অর্থনীতি আজ এক চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি, যেখানে একটি সমস্যা অন্যটিকে উস্কে দিচ্ছে এবং একটি তীব্র নিম্নমুখী পতনের জন্ম দিচ্ছে।পৃথিবী আজ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ধস এবং ক্রমবর্ধমান দুর্দশার এক অন্তহীন চক্র দ্বারা চিহ্নিত এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। এমনকি সবচেয়ে ধনী দেশগুলোতেও মূল্যবৃদ্ধির নির্মম কশাঘাতে মজুরি সংকুচিত হচ্ছে, আর সরকারি ব্যয়ে গভীর ছাঁটাই স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো সামাজিক পরিষেবাগুলোকে ক্রমাগত ধ্বংস করছে।এই পদক্ষেপগুলো শ্রমিক এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রার মানের ওপর সরাসরি আক্রমণ। কিন্তু অর্থনৈতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের জন্য বুর্জোয়াদের সমস্ত প্রচেষ্টা কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যকেই ধ্বংস করছে। বুর্জোয়ারা আজ এমন এক সংকটের ফাঁদে আটকা পড়েছে যার কোনো সমাধান তাদের হাতে নেই। বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার মূল চাবিকাঠি এটাই।তা সত্ত্বেও আমাদের মনে রাখতে হবে, লেনিন অনেক আগেই ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, পুঁজিবাদের ‘চূড়ান্ত সংকট’ বলে কিছু নেই। যদি একে উৎখাত না করা হয়, তবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার গভীরতম সংকট থেকেও সবসময় ঘুরে দাঁড়াবে, যদিও তা হবে মানবতার জন্য এক ভয়াবহ মূল্যের বিনিময়ে!বিশ্বায়নের সীমাপুঁজিবাদী সংকটের প্রধান কারণগুলো হলো, একদিকে উৎপাদনের উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা, আর অন্যদিকে জাতিরাষ্ট্রের শ্বাসরোধী সংকীর্ণ কাঠামো—যা পুঁজিবাদের সৃষ্টি করা বিপুল উৎপাদিকা শক্তিকে ধারণ করতে নিতান্তই অক্ষম।কিছু সময়ের জন্য ‘বিশ্বায়ন’ নামে পরিচিত বেবস্থাটি বিশ্ববাণিজ্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজনের তীব্রতার মাধ্যমে বুর্জোয়াদের জাতিরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা আংশিকভাবে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর চীন, ভারত ও রাশিয়া পুঁজিবাদী বিশ্ববজারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়। বিগত কয়েক দশকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকে থাকা ও বৃদ্ধির প্রধান উপায় ছিল এটাই।প্রাচীন আলকেমিস্টরা যেমন বিশ্বাস করতেন যে তাঁরা সাধারণ ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করার গোপন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, ঠিক তেমনি বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরাও বিশ্বাস করেছিলেন যে তাঁরা পুঁজিবাদের সমস্ত সমস্যার গোপন মহৌষধ খুঁজে পেয়েছেন।এখন সেই কল্পনাগুলো ফ্যানার মতোই পানিতে মিলিয়ে গেছে। এটা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে এই প্রক্রিয়া তার শেষ সীমানায় পৌঁছে উল্টো দিকে যাত্রা শুরু করেছে। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ এবং সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপগুলোই এখন প্রধান প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে—ঠিক সেই একই প্রবণতা যা ১৯৩০ এর দশকের মন্দাকে ‘মহা মন্দায়’ (Great Depression) রূপান্তর করেছিল।এটি সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এক চূড়ান্ত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই পদক্ষেপ অনিবার্যভাবে জাতিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটিয়েছে এবং সামরিক সংঘাত ও সংরক্ষণবাদকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে আমেরিকা!’-র ব্যানারে যে হম্বিতম্বি বা কোলাহলপূর্ণ প্রচারণা চালাচ্ছে, তার মধ্য দিয়ে বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ‘সবার আগে আমেরিকা’ মানে হলো বাকি বিশ্বকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে ঠেলে দেওয়া, যা আরও বেশি দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ এবং বাণিজ্য যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে বিশ্বকে।অন্তহীন বিভীষিকাসংকট আজ প্রতিটি ক্ষেত্রেই অস্থিতিশীলতার রূপ নিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে: অর্থনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক। দরিদ্র দেশগুলোতে, সাম্রাজ্যবাদী শুদখরদের নির্মম ঋণের ফাঁদে পিষ্ট হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।২০২৩ সালের জুনে জাতিসংঘের হিসাবে দেখা গেছে যে, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১১ কোটিতে, যা কভিড মহামারী পূর্বের তুলনায় এক বিশাল বৃদ্ধি। আর এটা ছিল গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের হিসাব।এই বিভীষিকা থেকে বাঁচার মরিয়া প্রচেষ্টায়, বিপুল সংখ্যক মানুষ আমেরিকা এবং ইউরোপের মতো দেশগুলোতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। যারা ভূমধ্যসাগর বা রিও গ্রান্ডে পাড়ি দেওয়ার কঠিন এবং বিপজ্জনক পথ বেছে নেয়, তারা পথে অকথ্য নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়। প্রতি বছর এই প্রচেষ্টায় হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে যাচ্ছে।এগুলোই তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদের সহিংস কার্যকলাপের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধসের ভয়াবহ পরিণতি যা কিনা অকল্পনীয় মাত্রায় ধ্বংস, মৃত্যু এবং বিনাশ ডেকে আনছে।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, কিছু সময়ের জন্য আমেরিকা বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হয়ে উঠে। বিপুল ক্ষমতার সাথে সাথে আসে তাদের বিপুল অহংকার। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সর্বত্র তার ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়। অর্থনৈতিক শক্তি এবং সামরিক পেশীশক্তি ব্যবহার করে সেই সকল জাতিকে দমন করে যারা ওয়াশিংটনের সামনে মাথা নোয়াতে অস্বীকার করেছিল।বলকান এবং অন্যান্য প্রাক্তন সোভিয়েত প্রভাব- ক্ষেত্রগুলোয় নিয়ন্ত্রণ দখল করার পর, তারা ইরাকের ওপর বিনা উসকানিতে এক নৃশংস আক্রমণ চালায়, যার ফলে দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। আফগানিস্তানে আগ্রাসন ছিল আরও একটি রক্তাক্ত অধ্যায়। সেই হতভাগ্য জনপদে কত প্রাণ ঝরেছে তা কেউ জানে না।কিন্তু মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সিরিয়ায় উন্মোচিত হয়ে পড়ে, যেখানে রাশিয়া এবং ইরানের হস্তক্ষেপের ফলে আমেরিকানরা পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে। এটি পরিস্থিতির এক আকস্মিক পরিবর্তন চিহ্নিত করে। সেই সময় থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একের পর এক অপমানজনক ধাক্কা খেয়েই চলেছে।এই ঘটনাগুলিই বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের সংকটের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। উনবিংশ শতাব্দীতে, সেইকালের প্রধান বিশ্বশক্তি হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় নিয়েছে।পুঁজিবাদের সংকট এবং জাতিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা পৃথিবীকে অনেক বেশি উত্তাল এবং বিপজ্জনক করে তুলছে। ‘বিশ্বের দারোগা’ হওয়ার কাজটি এখন ক্রমশ জটিল এবং ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সবখানেই সমস্যার আগুন জ্বলে উঠছে এবং প্রাক্তন মিত্ররা দুর্বলতা আঁচ করতে পেরে ‘বড় কর্তা’র বিরুদ্ধে জোট বাঁধছে।মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ এই গ্রহের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। এর সামরিক ব্যয় পরবর্তী শীর্ষ দশটি দেশের সম্মিলিত ব্যয়ের সমান। এবং তবুও, এটি বিশ্বের কোনো অঞ্চলেই নিজের ইচ্ছা বা দাপট নির্ণায়কভাবে চাপিয়ে দিতে অক্ষম।গাজার ভয়াবহ ঘটনাবলী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হিমশীতল নিষ্ঠুরতা এবং জঘন্য ভণ্ডামিকে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। দানবীয় ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর যে পৈশাচিক গণহত্যা চালিয়েছে, আমেরিকা ছিল তার সক্রিয় অংশীদার।মার্কিন ‘শাসক চক্রের’ সক্রিয় সমর্থন ছাড়া এই অপরাধমূলক আগ্রাসী যুদ্ধ একদিনও চলতে পারত না। তবুও, এই ভুক্তভোগীদের ভাগ্য নিয়ে ভণ্ডামিপূর্ণ হাহাকার করার আড়ালে, ওয়াশিংটন নেতানিয়াহুর কসাইবৃত্তিতে সহায়তা করার জন্য ক্রমাগত অস্ত্র এবং অর্থ পাঠিয়ে গেছে।কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমেরিকান স্বার্থের অনুকূলে কাজ করতে ইসরায়েলিদের বাধ্য করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের পূর্ণ ব্যর্থতা। তারা যতই সুতোয় টান দিক না কেন, এই পুতুলটি তার নিজের সুরেই নেচে গেছে। এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে আমেরিকান শক্তির পতনের একটি অত্যন্ত শিক্ষণীয় ইঙ্গিত।এক জাতির অন্যকে দমন করার ক্ষমতা পরম নয়, বরং আপেক্ষিক। পরিস্থিতি স্থবির নয়, বরং গতিশীল এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, অতীতে অনগ্রসর এবং নিপীড়িত জাতিগুলোও আগ্রাসী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে পারে এবং তাদের প্রতিবেশীদের ওপর চড়াও হয়ে তাদের দমন ও শোষণ করার চেষ্টা করতে পারে।আজ তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শক্তি। এটি একটি আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। এর বিপরীতে, রাশিয়া এবং চীন পুঁজিবাদের পথে পা বাড়িয়ে নিজেদের বিশ্বব্যাপী প্রভাবসম্পন্ন শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে জাহির করেছে। এটি তাদের আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের সাথে সরাসরি সংঘাতে নিয়ে এসেছে।চীন এবং রাশিয়া এখনো আমেরিকার সমপর্যায়ের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি অর্জন করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু তারা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা বিশ্বজুড়ে ওয়াশিংটনকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে বাজার, প্রভাব-বলয়, কাঁচামাল এবং লাভজনক বিনিয়োগের জন্য । ইউক্রেন এবং গাজার যুদ্ধ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার চাক্ষুষ প্রমাণ দিয়েছে।অতীতে, বিদ্যমান উত্তেজনাগুলো হয়তো বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে একটি বড় যুদ্ধের জন্ম দিত। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতি অন্তত বর্তমানে এই সম্ভাবনাকে কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।পুঁজিপতিরা দেশপ্রেম, গণতন্ত্র বা অন্য কোনো গালভরা নীতির জন্য যুদ্ধ করে না। তারা যুদ্ধ করে মুনাফার জন্য বিদেশি বাজার দখল করতে, কাঁচামালের উৎস (যেমন তেল) দখল করতে এবং নিজেদের প্রভাব-বলয় বিস্তার করতে।এটা কি একেবারেই পরিষ্কার নয়? এবং এটাও কি সুস্পষ্ট নয় যে, একটি পারমাণবিক যুদ্ধ এর কোনোটিই অর্জন করতে পারবে না, বরং তা কেবল উভয় পক্ষের পারস্পরিক ধ্বংসই ডেকে আনবে? তারা এমনকি এই পরিস্থিতি বর্ণনা করার জন্য একটি শব্দবন্ধও তৈরি করেছে: MAD ( Mutually Assured Destruction) বা ‘নিশ্চিত পারস্পরিক ধ্বংস’।প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে খোলাখুলি যুদ্ধের বিরুদ্ধে আরেকটি নির্ণায়ক কারণ হলো যুদ্ধের প্রতি ব্যাপক জনরোষ বা বিরোধিতা, বিশেষ করে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরে। সাম্প্রতিক একটি জরিপ ইঙ্গিত দেয় যে, আমেরিকার মাত্র ৫ শতাংশ জনগণ ইউক্রেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে।ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা যে অপমানজনক পরাজয় বরণ করেছে, তা আমেরিকার জনগণের চেতনায় গভীরভাবে গেঁথে আছে, তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে এই ভীতি যে, রাশিয়ার সাথে সরাসরি সামরিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা একটি গুরুতর প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বযুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবুও ইউক্রেনের মতো অনেক ‘ছোট’ যুদ্ধ এবং ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ (proxy war) বা অন্যের হয়ে লড়া যুদ্ধ চলতে থাকবে। এই ধরনের যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এটি সাধারণ অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে তুলবে এবং বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলার আগুনে ঘি ঢালবে। গাজার ঘটনাবলী এই বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে।এই ব্যবস্থা মানবজাতির জন্য যে ভবিষ্যৎ প্রস্তাব করছে তা কেবলই অন্তহীন দুর্দশা, ভোগান্তি, রোগব্যাধি এবং যুদ্ধের সমষ্টি। লেনিনের ভাষায়: পুঁজিবাদ হলো অন্তহীন বিভীষিকা।বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সংকটআগামী দিনগুলোতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের চেয়ে ১৯৩০ এর দশকের পরিস্থিতির সাথেই বেশি মিলবে। তাই প্রশ্ন জাগে: অদূর ভবিষ্যতে কি বুর্জোয়া গণতন্ত্র অক্ষত থাকবে?প্রকৃতপক্ষে, গণতন্ত্র হলো মুষ্টিমেয় কিছু ধনী ও সুবিধাপ্রাপ্ত জাতির একচেটিয়া অধিকার, যেখানে শ্রমিক শ্রেণিকে কিছু সুযোগ-সুবিধা বা ‘ছাড়’ দেওয়ার মাধ্যমে শ্রেণিযুদ্ধকে একটি গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব হয়।এটাই ছিল সেই বস্তুগত ভিত্তি যার ওপর দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মতো দেশগুলোতে তথাকথিত গণতন্ত্র দশকের পর দশক টিকে ছিল। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, টোরি ও লেবার পার্টি, তারা ক্ষমতায় পালাবদল করেছে ঠিকই, কিন্তু মৌলিক কোনো পার্থক্য তৈরি করতে পারেনি।বাস্তবে, বুর্জোয়া গণতন্ত্র হলো নিছক একটি ‘হাসিমাখা মুখোশ’—এমন এক ভনিতা যার আড়ালে লুকিয়ে আছে ব্যাংক ও বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর একনায়কত্ব। শাসক শ্রেণি যখন জনগণকে আর কোনো সুযোগ-সুবিধা দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন সেই হাসিমাখা মুখোশ একপাশে ছুড়ে ফেলা হয় এবং উন্মোচিত হয় সহিংসতা ও জবরদস্তিমূলক শাসনের কুৎসিত বাস্তবতা। এটি এখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।বলা হতো মুক্ত বাজার নাকি গণতন্ত্রের গ্যারান্টি বা রক্ষাকবচ। কিন্তু গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদ হলো পরস্পরবিরোধী। পুঁজির কৌশলবিদরা এখন প্রকাশ্যেই বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কার্যকারিতা এবং খোদ পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করছেন।‘প্রতিটি নাগরিকের সমান সুযোগ রয়েছে’ এই পুরনো এবং সান্ত্বনাদায়ক রূপকথাটি এখন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। ধনী দেশগুলোতেও আজ একদিকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, গৃহহীনতা ও হতাশার বিশাল স্তূপ, আর অন্যদিকে তার সামনেই নির্লজ্জভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে অশ্লীল সম্পদ ও বিলাসিতা।গভীরতর হতে থাকা অর্থনৈতিক পতন এখন কেবল শ্রমিক শ্রেণিকেই নয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি উল্লেখযোগ্য অংশকেও গ্রাস করছে। অর্থনৈতিক ধাক্কা, জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকট, আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হারের ক্রমাগত বৃদ্ধি ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য দেউলিয়াত্ব ডেকে আনছে। সমাজের অতি-ধনী এবং তাদের চাটুকাররা ছাড়া সমাজের সর্বস্তরে আজ ভবিষ্যতের জন্য এক সাধারণ নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি বিরাজ করছে।এই ব্যবস্থার বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করার কথা ছিল সর্বজনীন সমৃদ্ধির ওপর। কিন্তু পুঁজি এখন ক্রমশ মুষ্টিমেয় কিছু কোটিপতি, বিশাল ব্যাংক এবং কর্পোরেশনের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে।গণতন্ত্রের পরিবর্তে আমরা দেখছি খুব সামান্য আড়ালে থাকা এক ধনিকতন্ত্রের শাসন। সম্পদ ক্ষমতা কেনে, এটা সবাই জানে। গণতন্ত্র মানে হলো ‘এক নাগরিক, এক ভোট’। কিন্তু পুঁজিবাদ মানে হলো ‘এক ডলার, এক ভোট’। কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করলেই হোয়াইট হাউসে প্রবেশের টিকেট কেনা যায়।এই সত্যটি অধিকাংশ মানুষের কাছে ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে উঠছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বাড়ছে উদাসীনতা, আর শাসক অভিজাত ও তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বাড়ছে অবিশ্বাস—তথা ঘৃণা।সংসদীয় শাসনব্যবস্থা নিজেই এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। নির্বাচিত সংস্থাগুলো নিছক আড্ডখানায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রকৃত ক্ষমতা সংসদ থেকে ক্যাবিনেটে, আর ক্যাবিনেট থেকে অনির্বাচিত আমলা ও ‘উপদেষ্টা’দের ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে।পুলিশ ও বিচার বিভাগ যে কোনোভাবে স্বাধীন, এই নির্লজ্জ মিথ্যাটি সবার সামনে ফাঁস হয়ে গেছে। শ্রেণিসংগ্রাম যত তীব্র হবে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বরূপ ততই উন্মোচিত হবে এবং অতীতে তাদের যেটুকু সম্মান বা কর্তৃত্ব ছিল, তাও তারা হারাবে।শেষ পর্যন্ত, বুর্জোয়ারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবে যে সমাজে বড্ড বেশি বিশৃঙ্খলা, অতিরিক্ত ধর্মঘট ও বিক্ষোভ, এবং অরাজকতা চলছে। তারা চিৎকার করে বলবে, “আমরা শৃঙ্খলা চাই!” এখনই আমরা দেখছি গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোর ওপর, যেমন বিক্ষোভ করার অধিকার, ধর্মঘট করার অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর, সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হচ্ছে।একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে, বুর্জোয়ারা কোনো না কোনো ফর্মে প্রকাশ্য একনায়কত্ব কায়েম করতে প্রলুব্ধ হবে। কিন্তু এটি কেবল তখনই একটি বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে যখন শ্রমিক শ্রেণি পরপর কতগুলো গুরুতর পরাজয়ের শিকার হয়, ঠিক যেমনটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে ঘটেছিল।কিন্তু তার অনেক আগেই, শ্রমিক শ্রেণি বুর্জোয়া রাষ্ট্রের শক্তির বিরুদ্ধে নিজের শক্তি যাচাই করার এবং ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বহু সুযোগ পাবে।ফ্যাসিবাদের ঝুঁকি কতটুকু?আন্তর্জাতিক স্তরে তথাকথিত বামপন্থীদের মধ্যে যারা ভাসা-ভাসা ধারণায় বিশ্বাসী, তারা বোকামি করে ট্রাম্পবাদকে(Trumpism) ফ্যাসিবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলে। এই ধরনের বিভ্রান্তি আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে সাহায্য করতে পারে না।এই কাণ্ডজ্ঞানহীনতা তাদেরকে সোজা ‘শ্রেণি-সহযোগিতাবাদি’ নীতির জলাভূমিতে নিয়ে ফেলে। ‘মন্দের ভালো’ (lesser evil), এই মিথ্যা ধারণা প্রচার করে তারা শ্রমিক শ্রেণি এবং তার সংগঠনগুলোকে বুর্জোয়াদের এক প্রতিক্রিয়াশীল অংশের বিরুদ্ধে অন্য অংশের সাথে হাত মেলাতে আহ্বান জানায়।এই ভুল নীতির কারণেই তারা ভোটারদের জো বাইডেন এবং ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করতে প্ররোচিত করেছিল—এমন একটি ভোট যার জন্য পরবর্তীতে অনেকেই তীব্র অনুশোচনা করেছে।‘ফ্যাসিবাদের’ কল্পিত বিপদ নিয়ে প্রতিনিয়ত চিৎকার-চেঁচামেচি করে তারা ভবিষ্যতে প্রকৃত ফ্যাসিবাদী শক্তির মুখোমুখি হওয়ার সময় শ্রমিক শ্রেণিকে নিরস্ত্র করে ফেলবে। আর বর্তমান পরিস্থিতির কথা বললে, তারা আসল বিষয়টিই ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে।চারপাশে প্রচুর ডানপন্থী বাচাল নেতা রয়েছে, এবং কেউ কেউ ক্ষমতায়ও নির্বাচিত হচ্ছে। কিন্তু এটি আর ‘ফ্যাসিবাদী শাসন’ এক নয়। ফ্যাসিবাদ হলো যখন শ্রমিক সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করার জন্য ধনীরা ক্ষুব্ধ পেটি-বুর্জোয়া বা ক্ষুদ্র মালিকানা শ্রেণির এক বিশাল অংশকে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা।১৯৩০ এর দশকে, সমাজের দ্বন্দ্বগুলোর মীমাংসা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হয়, এবং তা শেষ হয়েছিল হয় সর্বহারা বিপ্লবের জয়ে, অথবা ফ্যাসিবাদ বা বোনাপার্টবাদের (Bonapartism) মতো চরম প্রতিক্রিয়াশীলতার বিজয়ে।কিন্তু অতীতে ফ্যাসিস্টদের সমর্থন দিতে গিয়ে শাসক শ্রেণি তাদের হাত খুব বাজেভাবে পুড়িয়েছে। তারা আর সহজে সেই রাস্তায় পা বাড়াবে না।আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আজ শক্তির ভারসাম্যে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে এত দ্রুত কোনো সমাধান বা ফয়সালা সম্ভব নয়। ১৯৩০ এর দশকের তুলনায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সামাজিক ভিত্তি বা রিজার্ভ আজ অনেক দুর্বল, এবং শ্রমিক শ্রেণির আপেক্ষিক গুরুত্ব বা ওজন অনেক গুণ বেশি।উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে কৃষক সমাজ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অন্যদিকে সমাজের এক বিশাল অংশ যারা আগে নিজেদের মধ্যবিত্ত ভাবত (পেশাজীবী, দাপ্তরিক কর্মী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারি কর্মচারী, ডাক্তার এবং নার্স), তারা এখন সর্বহারার অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে এবং ইউনিয়নভুক্ত হয়েছে।ছাত্রসমাজ, যারা ১৯২০ ও ৩০ এর দশকে ফ্যাসিবাদের ‘অগ্রগামী বাহিনী’ হিসেবে কাজ করেছিল, তারা এখন তীব্রভাবে বামপন্থার দিকে ঝুঁকেছে এবং বিপ্লবী মতাদর্শ গ্রহণ করছে। অধিকাংশ দেশে শ্রমিক শ্রেণি গত কয়েক দশকে কোনো মারাত্মক পরাজয়ের শিকার হয়নি। তাদের শক্তি মূলত অক্ষত রয়েছে।বুর্জোয়ারা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির শক্তি বিপুলভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তারা চটজলদি প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়াশীলতার পথে হাঁটতে পারছে না।এর অর্থ হলো, শাসক শ্রেণি যখন অতীতের অর্জিত অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে, তখন তারা গুরুতর বাধার সম্মুখীন হবে। সংকটের গভীরতা এতটাই যে, তাদের হাড় পর্যন্ত ছাঁটাই করতে হবে। কিন্তু তা একের পর এক দেশে গণ-বিস্ফোরণ ঘটাতে নিশ্চিত।পরিবেশগত মহাবিপর্যয়বিরামহীন যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি, আজ মানবজাতি পৃথিবীর ওপর চালানো বলাৎকারের হুমকির মুখে। মুনাফার নিরন্তর সন্ধানে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আমাদের বাতাস, খাদ্য এবং পানিকে বিষাক্ত করে তুলেছে।পুঁজিবাদ আমাজন রেইনফরেস্ট এবং মেরু অঞ্চলের বরফস্তূপ ধ্বংস করছে। মহাসাগরগুলো প্লাস্টিকের স্তূপে শ্বাসরুদ্ধ এবং রাসায়নিক বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে ও প্রাণীকুল উদ্বেগজনক হারে বিলুপ্ত হচ্ছে। সমগ্র জাতিসমূহের ভবিষ্যৎ আজ ঝুঁকির মুখে।সমাজের দরিদ্রতম অংশ এবং শ্রমিক শ্রেণি দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এর ওপর, ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে, পুঁজিবাদ যে সংকট তৈরি করেছে তার দায়ভারও শাসক শ্রেণি তাদের কাঁধেই চাপাতে চাইছে।মার্কস ব্যাখ্যা করেছিলেন যে মানবজাতির সামনে দুটি পথ খোলা: সমাজতন্ত্র অথবা বর্বরতা। বর্বরতার উপাদানগুলো ইতিমধ্যেই সবচেয়ে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও বিদ্যমান এবং তা সভ্যতার অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলছে। কিন্তু এখন আমরা এ কথা বলার পূর্ণ অধিকার রাখি যে, পুঁজিবাদ খোদ মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যই এক চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই সমস্ত ঘটনা লক্ষ লক্ষ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বিবেককে নাড়া দেয়। কিন্তু কেবল নৈতিক ক্ষোভ এবং বিক্ষুব্ধ মিছিল মোটেও যথেষ্ট নয়। পরিবেশ আন্দোলন যদি নিজেকে কেবল ‘ফাঁকা বুলি’র রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখে, তবে তা নিজেকে অনিবার্য ব্যর্থতা বা অক্ষমতার দিকে ঠেলে দেবে।পরিবেশবাদীরা সমস্যার সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু তারা সঠিক রোগ নির্ণয় করতে ব্যর্থ, আর সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া সঠিক প্রতিকার বা চিকিৎসা অসম্ভব। পরিবেশ আন্দোলন কেবল তখনই তার লক্ষ্যে সফল হতে পারে, যদি তা একটি সুস্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন পুঁজিবাদ-বিরোধী বিপ্লবী অবস্থান গ্রহণ করে।আমাদের অবশ্যই আন্দোলনের সবচেয়ে অগ্রগামী অংশটির কাছে পৌঁছাতে হবে এবং তাদের বোঝাতে হবে যে মূল সমস্যাটি হলো খোদ পুঁজিবাদ। এই পরিবেশগত মহাবিপর্যয় হলো বাজার অর্থনীতির উন্মাদনা এবং মুনাফা-সর্বস্বতারই অনিবার্য ফলাফল।তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতি মানবজাতির কোনো সমস্যার সমাধান করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। এটি বিপুল অপচয়কারী, ধ্বংসাত্মক এবং অমানবিক। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কোনো প্রগতি সম্ভব নয়। পরিকল্পিত অর্থনীতির পক্ষে যুক্তিগুলো অকাট্য।ব্যাংকার এবং পুঁজিপতিদের হাত থেকে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং বাজারের অরাজকতাকে হটিয়ে একটি সুষম ও যুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আজ অপরিহার্য।পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এখন এমন এক জন্তুর বীভৎস রূপ ধারণ করেছে, যার বেঁচে থাকার আর কোনো ঐতিহাসিক যৌক্তিকতা অবশিষ্ট নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সে তার আসন্ন বিলুপ্তি মেনে নিচ্ছে। বরং বাস্তবতা তার ঠিক উল্টো।এই পচনশীল ও রুগ্ন ব্যবস্থাটি আজ এমন এক জরাজীর্ণ বৃদ্ধের মতো, যে নাছোড়বান্দা হয়ে প্রাণপণে জীবনকে আঁকড়ে ধরে আছে। শ্রমিক শ্রেণির সচেতন বিপ্লবী আন্দোলনের দ্বারা উৎখাত না হওয়া পর্যন্ত এটি এভাবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকবে।পুঁজিবাদের এই দীর্ঘস্থায়ী মরণ-যন্ত্রণার অবসান ঘটানো, বিপ্লবী অভ্যুত্থান এবং সমাজের আমূল পুনর্গঠনের মাধ্যমে, আজ শ্রমিক শ্রেণির ঐতিহাসিক দায়িত্ব।পুঁজিবাদের অস্তিত্ব আজ এই পৃথিবী গ্রহের ভবিষ্যতের জন্য এক ‘সুস্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ’ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবজাতিকে যদি বাঁচতে হয়, তবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অবশ্যই মরতে হবে।আত্মগত উপাদানপুঁজিবাদের সাধারণ সংকট থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব যে, এর চূড়ান্ত পতন অনিবার্য এবং তা এড়ানো অসম্ভব। একই অর্থে, সমাজতন্ত্রের বিজয়ও একটি ঐতিহাসিক অনিবার্যতা।সাধারণ অর্থে এটি সত্য। কিন্তু সাধারণ তাত্ত্বিক প্রস্তাবনা থেকে বাস্তব ঘটনাবলির সুনির্দিষ্ট বা মূর্ত ব্যাখ্যা পাওয়া অসম্ভব।যদি পুরো ব্যাপারটাই সম্পূর্ণ অনিবার্য হয়, তবে কোনো বিপ্লবী পার্টি, ট্রেড ইউনিয়ন, ধর্মঘট, বিক্ষোভ, তত্ত্বের অধ্যয়ন বা অন্য কিছুরই কোনো প্রয়োজন থাকত না। কিন্তু সমগ্র ইতিহাস ঠিক এর উল্টোটিই প্রমাণ করে। ইতিহাসের নির্ণায়ক মুহূর্তগুলোতে ‘আত্মগত উপাদান’ বা নেতৃত্ব এক অত্যন্ত মৌলিক ভূমিকা পালন করে।কার্ল মার্কস উল্লেখ করেছিলেন যে, সংগঠন ছাড়া শ্রমিক শ্রেণি শোষণের ‘কাঁচামাল’ ছাড়া আর কিছুই নয়। সংগঠন ছাড়া আমরা কিছুই নই। আর সংগঠনের শক্তিতেই আমরা সবকিছু।কিন্তু এখানেই আমরা সমস্যার মূল বিন্দুতে এসে দাঁড়াই। আসল সমস্যাটি হলো নেতৃত্বের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি—শ্রমিক নেতাদের পুরোপুরি পচন।ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা শ্রমিক শ্রেণির গণসংগঠনগুলো কয়েক দশকের আপেক্ষিক সমৃদ্ধির সময়ে শাসক শ্রেণি এবং পেটি-বুর্জোয়াদের চাপের মুখে পড়ে। এই চাপ সংগঠনগুলোর ওপর ‘শ্রমিক আমলাতন্ত্রের’ বা শ্রমিক নেতাদের আমলাতান্ত্রিক খবরদারিকে শক্তিশালী করে রেখেছে।পুঁজিবাদের সংকট মানেই অপরিহার্যভাবে সংস্কারবাদের সংকট। ডানপন্থী নেতারা সেই আদর্শগুলো পরিত্যাগ করেছে যার ওপর ভিত্তি করে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, এবং যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করার কথা, তাদের থেকেই তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে, শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব আজ বুর্জোয়াদের চাপের মুখে নতজানু। আমেরিকান সমাজতন্ত্রের পথিকৃৎ ড্যানিয়েল ডি লিওনের তৈরি করা এবং লেনিনের দ্বারা প্রায়শই উদ্ধৃত একটি বুলি ব্যবহার করে বলা যায়, তারা নিছকই “পুঁজির শ্রমিক লেফটেন্যান্ট”। তারা অতীতের প্রতিনিধিত্ব করে, বর্তমান বা ভবিষ্যতের নয়। এখন যে ঝঞ্জাবিক্ষুদ্ধ সময়ের সূচনা হচ্ছে, তাতে তারা খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে।কিন্তু সমস্যাটি কেবল ডানপন্থী সংস্কারবাদীদের দিয়েই শুরু বা শেষ হয় না।তথাকথিত বামদের নৈতিক দেউলিয়াত্ততথাকথিত বামপন্থীরা একটি বিশেষ সর্বনাশা ভূমিকা পালন করে এসেছে ও সব জায়গায় ডানপন্থী এবং কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমরা গ্রিসে সিপ্রাস(Tsipras) এবং সিরিজার(Syriza) অন্যান্য নেতাদের ক্ষেত্রে এটি দেখেছি। একই প্রক্রিয়া স্পেনের পোদেমোস(Podemos), আমেরিকায় বার্নি স্যান্ডার্স এবং ব্রিটেনে জেরেমি করবিনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।এই সব ক্ষেত্রেই, বাম নেতারা শুরুতে বহু মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিলেন, কিন্তু ডানপন্থীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করার পরপরই সেই আশা ধূলিসাৎ হয়ে যায়।এই নেতাদের ভীরুতা এবং দুর্বলতার জন্য অভিযুক্ত করা খুব সহজ। কিন্তু এখানে আমরা কোনো ব্যক্তিগত নৈতিকতা বা ব্যক্তিগত সাহসের কথা বলছি না, বরং আমরা মুখোমুখি হচ্ছি এক চরম রাজনৈতিক দুর্বলতার।বাম সংস্কারবাদীদের মূল সমস্যা হলো, তারা বিশ্বাস করে যে খোদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ না করেই বা একে না ভেঙেই জনগণের দাবিগুলো অর্জন করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে, ডানপন্থী সংস্কারবাদীদের সাথে তাদের কোনো পার্থক্য নেই, কেবল তফাৎ এই যে ডানপন্থীরা ব্যাংকার এবং পুঁজিপতিদের কাছে তাদের পূর্ণ আত্মসমর্পণের বিষয়টি লুকানোর কোনো প্রয়োজনই বোধ করে না।প্রধানত, আজকের ‘বামেরা’ আর সমাজতন্ত্র নিয়ে কোনো কথাই বলে না। ১৯৩০ এর দশকের পুরনো বাম নেতাদের ছায়াও তারা নয়। এর পরিবর্তে, তারা জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, আরও গণতান্ত্রিক অধিকার ইত্যাদির জন্য দুর্বল আবেদন-নিবেদন জানাতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে।তারা এখন আর পুঁজিবাদ নিয়ে কথা বলে না, বরং বলে ‘নব্যউদারবাদ’ (neoliberalism) নিয়ে- অর্থাৎ, ‘খারাপ’ পুঁজিবাদ বনাম ‘ভালো’ পুঁজিবাদ-যদিও এই কাল্পনিক ‘ভালো’ পুঁজিবাদটি আসলে কী, তা তারা কখনোই স্পষ্ট করে বলে না।যেহেতু তারা এই ব্যবস্থার সাথে সম্পর্ক ভাঙতে অস্বীকার করে, তাই বাম সংস্কারবাদীরা অনিবার্যভাবেই শাসক শ্রেণির সাথে একধরনের আপস বা সমঝোতা করার প্রয়োজন বোধ করে। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে তারা কোনো হুমকি নয় এবং পুঁজিপতিদের স্বার্থে শাসনকার্য পরিচালনা করার জন্য তাদের ওপর আস্থা রাখা যেতে পারে।এটাই ব্যাখ্যা করে কেন তারা শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে থাকা শাসক শ্রেণির প্রকাশ্য এজেন্ট বা দালাল—সেই ডানপন্থীদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে একগুঁয়েভাবে অস্বীকার করে। আর তারা এর সাফাই গায় ‘ঐক্য বজায় রাখার’ প্রয়োজনীয়তার দোহাই দিয়ে।শেষ পর্যন্ত, এটি তাদের সবসময়ই ডানপন্থীদের কাছে আত্মসমর্পণের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু যখন ডানপন্থীরা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তখন তারা কিন্তু একই রকম ভীরুতা বা দ্বিধা দেখায় না; বরং তারা সাথে সাথে বামপন্থীদের বিরুদ্ধে এক হিংস্র ‘উইচ হান্ট’ বা নির্মূল অভিযান শুরু করে দেয়।সুতরাং, এখানে ভীরুতা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত চরিত্রের প্রশ্ন নয়। এটি বাম সংস্কারবাদের ‘রাজনৈতিক ডিএনএ’র অবিচ্ছেদ্য অংশ।নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামপুঁজিবাদের সংকট বিদ্যমান সমাজ, তার মূল্যবোধ, তার নৈতিকতা এবং তার অসহনীয় অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিরোধিতার অনেক গভীর স্রোতের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেছে।সমাজের প্রধান দ্বন্দ্বটি এখনো মজুরি শ্রম এবং পুঁজির মধ্যকার বৈরিতাই রয়ে গেছে। তবে, নিপীড়ন বিভিন্ন রূপ নেয়, যার মধ্যে কিছু কিছু ‘মজুরি দাসত্বের’ চেয়েও অনেক প্রাচীন এবং গভীরে প্রোথিত।নিপীড়নের সবচেয়ে সর্বজনীন এবং বেদনাদায়ক রূপগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পুরুষশাসিত বিশ্বে নারীদের ওপর নিপীড়ন। সংকট নারীদের অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়িয়ে তুলছে। রাষ্ট্রীয় সামাজিক ব্যয়ের ছাঁটাই শিশু ও বয়স্কদের দেখাশোনার ভার অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নারীদের কাঁধে চাপাচ্ছে।বিশ্বজুড়ে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মহামারী চলছে। এবং গর্ভপাতের অধিকারের মতো অধিকারগুলো আজ আক্রমণের মুখে। এটি ফলে এক বিশাল প্রতিঘাত উসকে আসছে এবং বিশেষ করে তরুণ নারীদের মধ্যে এক লড়াকু মেজাজ গড়ে উঠছে।এই দানবীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারীদের বিদ্রোহ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মৌলিক গুরুত্ব বহন করে। নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হতে পারে না।সমস্ত ধরনের নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি অপরিহার্য অংশ।আমাদের অবস্থান খুবই সহজ: প্রতিটি সংগ্রামে, আমরা সবসময় নিপীড়কের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের পক্ষ নেব। কিন্তু আমাদের অবস্থান সংজ্ঞায়িত করার জন্য এই সাধারণ বিবৃতিটি যথেষ্ট নয়। আমাদের অবশ্যই যোগ করতে হবে যে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত একটি ‘নেতিবাচক’ দৃষ্টিভঙ্গি।অর্থাৎ: আমরা যেকোনো ধরনের নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরোধী, তা নারী, কৃষ্ণাঙ্গ বা অ-শ্বেতাঙ্গ মানুষ, সমকামী, রূপান্তরকামী বা অন্য কোনো নিপীড়িত গোষ্ঠী বা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে পরিচালিত হোক না কেন।তবে, বলা বাহুল্য আমরা ‘পরিচিতি সত্তার রাজনীতি’ বা ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’(identity politics) কে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করি, যা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার ছদ্মবেশে এক প্রতিক্রিয়াশীল ও বিভেদকামী ভূমিকা পালন করে। এটি শেষ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যকে দুর্বল করে এবং শাসক শ্রেণিকে অমূল্য সহায়তা প্রদান করে।শ্রমিক আন্দোলন সব ধরনের বিজাতীয় ধারণায় সংক্রমিত হয়ে পড়েছে: উত্তর-আধুনিকতাবাদ (postmodernism), আইডেন্টিটি পলিটিক্স, ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ‘বাম’ পেটি-বুর্জোয়াদের দ্বারা পাচার করে আনা অন্যান্য উদ্ভট আবর্জনা। এই পেটি-বুর্জোয়ারাই বিজাতীয় ও প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের বাহক বা ‘ট্রান্সমিশন বেল্ট’ হিসেবে কাজ করে।তথাকথিত উত্তর-আধুনিকতাবাদের উপজাত হিসেবে, আইডেন্টিটি পলিটিক্স ছাত্রদের মগজ ধোলাই করার কাজ করছে। এই বিজাতীয় ধারণাগুলো শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে আমলাতন্ত্র সবচেয়ে লড়াকু শ্রেণি-যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামে একে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।লেনিন কমিউনিস্টদের কেবল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ফ্রন্টেই নয়, বরং মতাদর্শগত ফ্রন্টেও লড়াই করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। আমরা মার্কসবাদী তত্ত্ব এবং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনের শক্ত ভিত্তির ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছি।এটি সব ধরনের ভাববাদী দর্শনের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক: তা ধর্মের খোলাখুলি, ছদ্মবেশহীন মরমীবাদই হোক, কিংবা উত্তর-আধুনিকতাবাদের চাতুর্যপূর্ণ, ছদ্মবেশী এবং বিষাক্ত মরমীবাদই হোক।তাই এই বিজাতীয় শ্রেণি-মতাদর্শ এবং এর পেটি-বুর্জোয়া প্রবক্তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিভেদকামী এবং প্রতিবিপ্লবী ধারণাগুলোর কাছে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না, যা কেবল মালিকদের এবং তাদের বহুপুরানো কৌশল—‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ (divide and rule)—এরই সুবিধা করে দেয়।প্রকৃতপক্ষে, কমিউনিজমের দিকে ধাবিত একদল তরুণের মধ্যে এই ক্ষতিকর ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই একটি সুস্থ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।কমিউনিস্টরা শ্রেণি রাজনীতির জমিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এবং বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা বা ধর্মের সমস্ত বিভাজনের ঊর্ধ্বে শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য রক্ষা করে। আপনি কালো না সাদা, নারী না পুরুষ—তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আপনার জীবনযাপন পদ্ধতি কেমন বা আপনার সঙ্গী কে বা কে নয়—তা নিয়েও আমাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। এগুলো একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় এবং আমলা, পুরোহিত বা রাজনীতিবিদদের—কারও দেখার বিষয় নয়।আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার একমাত্র শর্ত হলো আপনি সেই একমাত্র লক্ষ্যের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত ও ইচ্ছুক কিনা, যা নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রকৃত স্বাধীনতা, সাম্য এবং সত্যিকার মানবিক সম্পর্ক উপহার দিতে পারে: আর তা হলো শ্রমিক শ্রেণিকে মুক্ত করার পবিত্র সংগ্রাম।কিন্তু কমিউনিস্টদের সাথে যোগ দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো, আইডেন্টিটি পলিটিক্সের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল আবর্জনা আপনাকে দরজার বাইরে রেখেই প্রবেশ করতে হবে।ট্রেড ইউনিয়নসমূহবর্তমান সময়টি ইতিহাসের সবচেয়ে ঝঞ্জাবিক্ষুদ্ধ এবং আলোড়িত অধ্যায়। ‘শ্রেণিসংগ্রামের’ এক সাধারণ পুনরুজ্জীবনের মঞ্চ প্রস্তুত হয়ে গেছে। কিন্তু কাজটা সহজ হবে না। শ্রমিক শ্রেণি এক দীর্ঘ সুপ্ত অবস্থার পর এখন জেগে উঠতে শুরু করেছে। তাদের অনেক পুরনো পাঠ নতুন করে শিখতে হবে, এমনকি ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত হওয়ার মতো প্রাথমিক পাঠগুলোও।কিন্তু ইউনিয়নগুলো দিয়ে শুরু করে গণসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব সব জায়গাতেই এক শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে। তারা শ্রমিক শ্রেণির সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে নিজেদের সম্পূর্ণ অক্ষম ও দেউলিয়া প্রমাণ করেছে। তারা এমনকি ইউনিয়নগুলোকেও গড়ে তুলতে বা শক্তিশালী করতে পারেনি।এর ফলে, ডেলিভারি ড্রাইভার, কল সেন্টার কর্মী এবং এই ধরনের ‘অনিশ্চিত পেশায়’ নিয়োজিত নতুন প্রজন্মের তরুণ শ্রমিকদের বিশাল অংশ নিজেদের শোষণের ‘কাঁচামাল’ ছাড়া আর কিছুই মনে করতে পারছে না।অ্যামাজন গুদামঘরগুলোর মতো আধুনিক ‘সোয়েটশপ’ বা অমানবিক কারখানার ভয়াবহ পরিবেশে কাজ করে তারা নির্মম শোষণ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং স্বল্প মজুরির শিকার হচ্ছে। সেই দিন অনেক আগেই গত হয়েছে যখন শ্রমিকরা কেবল ধর্মঘটের হুমকি দিয়েই বড়সড় মজুরি বৃদ্ধি আদায় করতে পারত। মালিকরা এখন বলবে যে তারা বর্তমান মজুরির স্তর বজায় রাখতেই অক্ষম, আর বাড়তি সুযোগ-সুবিধা বা ‘ছাড়’ দেওয়া তো দূরের কথা।যারা এখনো শ্রেণি-শান্তি এবং ঐকমত্যের স্বপ্ন দেখছে, তারা অতীতে বাস করছে, পুঁজিবাদের এমন এক পর্যায়ে যার কোনো অস্তিত্ব আজ আর নেই। মার্কসবাদীরা নয়, বরং এই ইউনিয়ন নেতারাই হলো প্রকৃত আকাশকুসুম কল্পনাবিলাসী! আমাদের সামনে এক বিশাল দৃশ্যপট উন্মোচিত হচ্ছে যেখানে মহাকাব্যিক লড়াই হবে, কিন্তু ভুল নেতৃত্বের কারণে সর্বহারা শ্রেণির পরাজয়ও ঘটবে। যা প্রয়োজন তা হলো একটি পূর্ণাঙ্গ সংগ্রামশীলতা ও শ্রেণিসংগ্রামের পুনরুজ্জীবন।আমূল পরিবর্তনকামী (Radicalization) হওয়ার এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে এবং গভীরতর হবে। এটি ট্রেড ইউনিয়ন এবং কর্মক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের কাজের জন্য বিশাল সম্ভাবনা উন্মুক্ত করবে।সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটি সংস্কারবাদের বিরুদ্ধে একটি সিরিয়াস সংগ্রামের দাবি রাখে, শ্রমিক শ্রেণির গণসংগঠনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার সংগ্রাম, যা শুরু করতে হবে ইউনিয়নগুলো থেকেই। সেগুলোকে শ্রমিক শ্রেণির ‘লড়াকু সংগঠন’ হিসেবে রূপান্তর করতে হবে।কিন্তু এটি কেবল সংস্কারবাদী আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। ইউনিয়নগুলোকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ‘শুদ্ধ’ করতে হবে এবং শ্রেণি-সহযোগিতার নীতিগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে হবে।শুধু সংগ্রামশীলতাই যথেষ্ট নয়সংস্কারবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অর্থ এই নয় যে আমরা সংস্কারের বিরোধী। আমরা ইউনিয়ন নেতাদের এই কারণে সমালোচনা করি না যে তারা সংস্কারের জন্য লড়ছে, বরং ঠিক উল্টো কারণে—তারা আসলে লড়েই না।তারা মালিকদের সাথে আপস বা সমঝোতা খোঁজে, সংগ্রামশীল কর্মসূচি এড়িয়ে চলে, এবং যখন সাধারণ শ্রমিকদের চাপে পড়ে তারা বাধ্য হয়, তখন তারা ধর্মঘটকে সীমিত করতে এবং যত দ্রুত সম্ভব আন্দোলন শেষ করতে এক ‘পচা আপস’ এর দিকে যাওয়ার জন্য তাদের ক্ষমতার সবকিছুই করে।কমিউনিস্টরা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান ও অধিকারের উন্নতির জন্য ক্ষুদ্রতম সংস্কারের জন্যও লড়বে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে, অর্থবহ সংস্কারের সংগ্রাম কেবল ততটুকুই সফল হতে পারে যতটুকু তা এক সুদূরপ্রসারী এবং বিপ্লবী ব্যপ্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়।প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতাগুলো ততটাই উন্মোচিত হবে যতটা তা বাস্তবে পরীক্ষিত হবে। শ্রেণিসংগ্রামের পূর্ণবিকাশের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে আমরা যেকোনো অর্থবহ গণতান্ত্রিক দাবি রক্ষার জন্য লড়াই করব।সামগ্রিকভাবে শ্রমিক শ্রেণি কেবল তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শিখতে পারে। পুঁজিবাদের অধীনে অগ্রগতির জন্য দৈনন্দিন লড়াই ছাড়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অকল্পনীয়।কিন্তু শেষ বিচারে, ট্রেড ইউনিয়নের সংগ্রামশীলতা যথেষ্ট নয়। পুঁজিবাদী সংকটের পরিস্থিতিতে শ্রমিক শ্রেণি যা কিছু অর্জন করে, তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।মালিকরা ডান হাতে যা দেয়, বাম হাতে তা কেড়ে নেয়। মজুরি বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি বা কর বৃদ্ধির মাধ্যমে নস্যাৎ হয়ে যায়। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়।সংস্কারগুলো যাতে নস্যাৎ না হয়ে যায় তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো সমাজের আমূল পরিবর্তনের জন্য লড়াই করা। একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে, এই প্রতিরক্ষামূলক সংগ্রামগুলো আক্রমণাত্মক সংগ্রামে রূপান্তরিত হতে পারে। ‘আংশিক দাবিতে’ ছোট ছোট সংগ্রামের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই ক্ষমতার জন্য চূড়ান্ত যুদ্ধের জমিন প্রস্তুত হয়।পার্টির অপরিহার্যতাসমাজে শ্রমিক শ্রেণিই হলো একমাত্র প্রকৃত বিপ্লবী শ্রেণি। উৎপাদনের উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা এবং মুষ্টিমেয় কিছু ধনী পরগাছার সর্বগ্রাসী লোভ মেটানোর জন্য মানব শ্রমশক্তির শোষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার কোনো কারণ একমাত্র তাদেরই নেই।সমাজ পরিবর্তনের জন্য শ্রমিক শ্রেণির অসচেতন বা আধা-সচেতন প্রচেষ্টাকে সচেতন করে তোলাই হলো কমিউনিস্টদের কর্তব্য। ব্যাংকার এবং পুঁজিপতিদের একনায়কত্ব উচ্ছেদ করার প্রয়োজনীয় শক্তি কেবল শ্রমিক শ্রেণিরই আছে।আমাদের কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, শ্রমিক শ্রেণির সদয় অনুমতি ছাড়া একটি বৈদ্যুতিক বাতিও জ্বলে না, একটি চাকাও ঘোরে না এবং একটি টেলিফোনও বাজে না।এটি এক বিশাল শক্তি। এবং তবুও এটি কেবল একটি সুপ্ত বা সম্ভাবনাময় শক্তি মাত্র। সেই সুপ্ত শক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অন্য কিছু প্রয়োজন। সেই ‘কিছু’টি হলো সংগঠন।প্রকৃতির শক্তির সাথে এর একটি নিখুঁত উপমা রয়েছে। বাষ্প ঠিক তেমনই একটি শক্তি। এটিই শিল্প বিপ্লবের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। এই সেই শক্তি যা ইঞ্জিন চালায়, আলো, তাপ ও শক্তি জোগায়—যা বড় বড় শহরগুলোতে জীবন ও গতি সঞ্চার করে।কিন্তু বাষ্প তখনই শক্তিতে পরিণত হয় যখন তাকে ‘পিস্টন বক্স’ নামক একটি যান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পুঞ্জীভূত করা হয়। এমন যান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া তা কেবল বাতাসে অনর্থক মিলিয়ে যায়। তা কেবল একটি সুপ্ত সম্ভাবনা হয়েই রয়ে যায়, আর কিছু নয়।একেবারে প্রাথমিক স্তরেও, প্রতিটি শ্রেণি-সচেতন শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বোঝেন। কিন্তু সর্বহারা সংগঠনের সর্বোচ্চ বিকাশ হলো সেই বিপ্লবী পার্টি, যা পুঁজিবাদ উচ্ছেদের সংগ্রামে শ্রেণির সবচেয়ে সচেতন, নিবেদিতপ্রাণ এবং লড়াকু অংশকে ঐক্যবদ্ধ করে। এমন একটি পার্টি গড়ে তোলাই এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ।চেতনাক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিদ্যমান ব্যবস্থার ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সর্বত্র নির্বাচনে এই যে ডানে, বামে এবং আবার ডানে—এই তীব্র দোদুল্যমানত’কে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?ক্ষীণদৃষ্টির বাম সংস্কারবাদীরা শ্রমিকদের তথাকথিত ‘অনগ্রসরতা’র দোহাই দিয়ে তাদের দোষারোপ করে। এভাবেই তারা নিজেদের সাফাই গায় এবং নিজেদের সর্বনাশা ভূমিকাকে আড়াল করার চেষ্টা করে। কিন্তু এটি আসলে যা প্রতিফলিত করে তা হলো চরম হতাশা এবং একটি সিরিয়াস বিকল্পের পূর্ণ অভাব। জনগণ মরিয়া হয়ে মুক্তির পথ খুঁজছে। এবং তারা একের পর এক বিকল্প যাচাই করে দেখছে। একটার পর একটা সরকার, দল এবং নেতাকে পরীক্ষায় ফেলা হচ্ছে এবং অযোগ্য প্রমাণিত হলে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।এই প্রক্রিয়ায়, সংস্কারবাদীরা এক অত্যন্ত শোচনীয় ভূমিকা পালন করছে, এবং বাম সংস্কারবাদীরা, যদি সম্ভব হয়, আরও বেশি শোচনীয় ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্য দিয়ে আমরা চেতনার এক পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। এটি এমন কোনো ধীর বা মন্থর পরিবর্তন নয় যা সাধারণত আশা করা হয়।স্বাভাবিকভাবেই, এটি পেকে উঠতে সময় নেয়, কিন্তু পরিমাণের পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত এমন এক ক্রান্তিলগ্নে পৌঁছায় যেখানে ‘পরিমাণ’ হঠাৎ করেই ‘গুণে’ রূপান্তরিত হয়। চেতনার আকস্মিক ও তীব্র পরিবর্তন এই পুরো পরিস্থিতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে।ঠিক এই ধরনের পরিবর্তনই আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে। একটি জরিপে ১,০০০ এর বেশি ব্রিটিশ প্রাপ্তবয়স্ককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে “পুঁজিবাদ” শব্দটির সাথে তারা কোন শব্দ বা বাক্যাংশগুলোকে সবচেয়ে বেশি মেলাতে পারেন।শীর্ষ ফলাফলগুলো ছিল “লোভ” (৭৩ শতাংশ), “সাফল্য অর্জনের নিরন্তর চাপ” (৭০ শতাংশ) এবং “দুর্নীতি” (৬৯ শতাংশ)। ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা এই বাক্যের সাথে একমত হয়েছেন যে “পুঁজিবাদ ধনীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং তারাই রাজনৈতিক এজেন্ডা ঠিক করে।”এই পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে যুবকদের মধ্যে কমিউনিস্ট মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতায়। এই তরুণরা নিজেদের ‘কমিউনিস্ট’ বলে পরিচয় দেয়, যদিও তাদের অনেকেই হয়তো কখনো কমিউনিস্ট ইশতেহার পড়েনি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান নেই।কিন্তু তথাকথিত বামপন্থীদের বিশ্বাসঘাতকতা খোদ ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটিকে তাদের কাছে দুর্গন্ধযুক্ত করে তুলেছে। এটি আর শ্রেষ্ঠ মানুষদের মনে কোনো সাড়া জাগায় না। তারা বলছে, “আমরা কমিউনিজম চাই। কেবল সেটাই এবং তার চেয়ে কম কিছু নয়।”একজন কমিউনিস্ট কে?কমিউনিস্ট ইশতেহার-এর ‘সর্বহারা ও কমিউনিস্ট’ নামক অধ্যায়ে আমরা নিম্নোক্ত কথাগুলো পাই:“সামগ্রিকভাবে সর্বহারাদের সাথে কমিউনিস্টদের সম্বন্ধ কী?“অন্যান্য শ্রমিকশ্রেণির পার্টিগুলোর বিপরীতে কমিউনিস্টরা কোনো পৃথক পার্টি গঠন করে না।“সামগ্রিকভাবে সমগ্র সর্বহারা শ্রেণির স্বার্থের বাইরে তাদের আলাদা ও পৃথক কোনো স্বার্থ নেই।“সর্বহারা আন্দোলনকে নিজেদের মনগড়া ছাঁচে ঢালবার জন্য তারা কোনো সংকীর্ণতবাদী নীতি খাড়া করে না।“কমিউনিস্টরা অন্যান্য শ্রমিক পার্টির চাইতে কেবল এই দিক দিয়েই পৃথক যে: ১. বিভিন্ন দেশের সর্বহারাদের জাতীয় সংগ্রামে তারা জাতি-নির্বিশেষে সমগ্র সর্বহারা শ্রেণির সাধারণ স্বার্থগুলোকেই নির্দেশ করে এবং সামনে নিয়ে আসে।[...]“কাজেই, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কমিউনিস্টরা হলো প্রতিটি দেশের শ্রমিক শ্রেণির পার্টিগুলোর সবচাইতে অগ্রসর ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অংশ, যে অংশটি অন্যদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়; অন্যদিকে, তাত্ত্বিক দিক দিয়ে সর্বহারাদের বিশাল অংশের তুলনায় তাদের সুবিধা এই যে, সর্বহারা আন্দোলনের অগ্রগমন রেখা বা গতিপথ , তার শর্তাবলী এবং তার চূড়ান্ত সাধারণ ফলাফল সম্পর্কে তাদের স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ধারণা রয়েছে।”এই লাইনগুলো বিষয়টির সারমর্ম অত্যন্ত চমৎকারভাবে প্রকাশ করে।বিপ্লবী কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের জন্য কি এটাই সঠিক সময়?তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান জনরোষ পুঁজিবাদের সাফাই গায়কদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। তারা এক অনিশ্চিত এবং উত্তাল ভবিষ্যতের দিকে গভীর আতঙ্কের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।এই সর্বগ্রাসী নৈরাশ্যের পরিস্থিতির সাথে সাথে, বুর্জোয়াদের অধিকতর চিন্তাশীল প্রতিনিধিরা ১৯১৭ সালের পরিস্থিতির সাথে বর্তমান বিশ্বের অস্বস্তিকর সাদৃশ্য খুঁজে পেতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটেই, একটি ‘কলঙ্কহীন পতাকা’(clean banner) এবং সুস্পষ্ট বিপ্লবী নীতিমালার অধিকারী একটি বিপ্লবী পার্টির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।আমাদের আন্দোলনের আন্তর্জাতিক চরিত্র এই বাস্তব সত্য থেকে উদ্ভূত যে পুঁজিবাদ হলো একটি বিশ্ব ব্যবস্থা। একেবারে শুরু থেকেই, মার্কস শ্রমিক শ্রেণির একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।তবে, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের স্ট্যালিনবাদী অধঃপতনের পর থেকে, এমন কোনো সংগঠনের আর অস্তিত্ব নেই। তাই এখনই সময় একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সূচনা করার!কেউ কেউ একে ‘সংকীর্ণতাবাদ’ হিসেবে দেখবে। কিন্তু এটি মোটেও তা নয়। অতি-বাম এবং সংকীর্ণতাবাদী সেই সব ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে আমাদের বিন্দুমাত্র মিল নেই, যারা শ্রমিক আন্দোলনের কিনারে বা প্রান্তসীমায় হাস্যকর ময়ূরের মতো পেখম তুলে ঘুরে বেড়ায়।আমাদের অবশ্যই এই সংকীর্ণতাবাদীদের দিকে পিঠ ঘুরিয়ে সেই নতুন ও সতেজ অংশটির দিকে তাকাতে হবে যারা কমিউনিজমের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এমন একটি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কোনো অধৈর্য বা আত্মগত স্বেচ্ছাবাদ এর বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি বস্তুগত পরিস্থিতির স্বচ্ছ বোঝাপড়ার মধ্যেই নিহিত। এটি, এবং অন্য কিছু নয়, যা এমন একটি পদক্ষেপকে পরম প্রয়োজনীয় এবং অনিবার্য করে তোলে।আসুন ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখি:ব্রিটেন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশের সাম্প্রতিক জরিপগুলো আমাদের খুব স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে কমিউনিজমের ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কমিউনিজমের সম্ভাবনা বিপুল। আমাদের কাজ হলো একে একটি সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করা।অগ্রবাহিনীকে(vanguard) একটি খাঁটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিতে সংগঠিত করে, এর সাথে একটি সুশৃঙ্খল বলশেভিক সংগঠনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে, মার্কসবাদী ভাবাদর্শে দীক্ষিত করে এবং লেনিনীয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করে আমরা এমন একটি শক্তি গড়ে তুলব যা আগামী দিনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিকাশে এক চাবিকাঠির ভূমিকা পালন করতে পারবে।এটাই আমাদের কাজ। এটি অর্জনের জন্য আমাদের সমস্ত বাধা অতিক্রম করতেই হবে।স্তালিনবাদ বনাম বলশেভিজমদীর্ঘকাল ধরে, কমিউনিজমের শত্রুরা বিশ্বাস করত যে তারা সফলভাবে অক্টোবর বিপ্লবের ভূত তাড়াতে সক্ষম হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তাদের সেই বিশ্বাসকেই নিশ্চিত করেছে বলে মনে হয়েছিল যে কমিউনিজম মারা গেছে এবং তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। “শীতল যুদ্ধ শেষ,” তারা দম্ভভরে বলেছিল, “এবং আমরাই জিতেছি।”তবে, আমাদের শ্রেণি শত্রুরা যে গালগল্প বা মিথ অনবরত প্রচার করে তার বিপরীতে সত্য হলো, ১৯৮০ এর দশকে যা ধসে পড়েছিল তা কমিউনিজম নয়, বরং তা ছিল স্তালিনবাদ—এক ভয়াবহ, আমলাতান্ত্রিক এবং সর্বাত্মকবাদী ব্যঙ্গচিত্র, যার সাথে ১৯১৭ সালে লেনিন এবং বলশেভিকদের প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক গণতন্ত্রের শাসনের কোনো সম্পর্কই ছিল না।লেনিনের মৃত্যুর পর বিপ্লবের ভাটার টানের সুযোগে ক্ষমতায় আসা সুবিধভোগী আমলা গোষ্ঠীর ওপর ভর করে স্তালিন বলশেভিজমের বিরুদ্ধে একটি ‘রাজনৈতিক প্রতিবিপ্লব’ ঘটিয়েছিলেন। তার প্রতিবিপ্লবী একনায়কত্বকে সুসংহত করার জন্য, স্তালিন লেনিনের সমস্ত কমরেড এবং বিপুল সংখ্যক প্রকৃত কমিউনিস্টকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।স্তালিনবাদ এবং বলশেভিজম ‘একই’ হওয়া তো দূরের কথা, তারা কেবল ধরনগতভাবেই আলাদা নয়: তারা পরস্পরবিরোধী এবং একে অপরের মরণপণ শত্রু, যারা এক রক্তের নদী দ্বারা বিভক্ত।‘কমিউনিস্ট’ পার্টিগুলোর অধঃপতনকমিউনিজম অবিচ্ছেদ্যভাবে লেনিনের নাম এবং রুশ বিপ্লবের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের সাথে জড়িত, কিন্তু আজকের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো কেবল ‘নামেই’ কমিউনিস্ট। সেই সব পার্টির নেতারা বহু আগেই লেনিন এবং বলশেভিজমের আদর্শ পরিত্যাগ করেছে।লেনিনবাদের সাথে একটি চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটেছিল যখন ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ (socialism in one country) এর মার্কসবাদ-বিরোধী নীতিটি গ্রহণ করা হয়। ১৯২৮ সালে, ট্রটস্কি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এটি অনিবার্যভাবে বিশ্বের প্রতিটি কমিউনিস্ট পার্টির ‘জাতীয়-সংস্কারবাদী অধঃপতন’ ঘটাবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।প্রথমে, কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা স্তালিন এবং আমলাতন্ত্রের নির্দেশগুলো অনুগতভাবে পালন করত, মস্কো থেকে আসা প্রতিটি বাঁক ও মোড় দাসসুলভভাবে অনুসরণ করত। পরবর্তীতে তারা স্তালিনকে প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু লেনিনের কাছে ফিরে আসার পরিবর্তে তারা তীব্রভাবে ডানপন্থী মোড় নেয়। মস্কোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর, অধিকাংশ দেশে এই পার্টিগুলো সংস্কারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি গ্রহণ করে।‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ এর সেই মারাত্মক যুক্তি বা লজিক অনুসরণ করে, প্রতিটি জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব তাদের নিজ দেশের বুর্জোয়াদের স্বার্থের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এটি কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সম্পূর্ণ অধঃপতন, এমনকি তাদের পুরোপুরি বিলুপ্তির দিকে নিয়ে গেছে।এর সবচেয়ে চরম উদাহরণ ছিল ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টি (PCI), যা একসময় ইউরোপের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী পার্টি ছিল। জাতীয়-সংস্কারবাদী অধঃপতনের নীতিগুলো শেষ পর্যন্ত পিসিআই এর বিলুপ্তি এবং একটি বুর্জোয়া সংস্কারবাদী দলে এর রূপান্তর ঘটিয়েছে।ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির এখন কেবল একটি দৈনিক পত্রিকা, মর্নিং স্টার-এর মাধ্যমেই কিছুটা প্রভাব আছে, যার রাজনৈতিক লাইন বাম সংস্কারবাদের এক নিস্তেজ সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়। কার্যত, এটি ট্রেড ইউনিয়ন আমলাতন্ত্রের জন্য একটি ‘বাম আবরণ’ হিসেবে কাজ করে।স্প্যানিশ কমিউনিস্ট পার্টি (PCE) এমন একটি জোট সরকারের অংশ যারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর যুদ্ধের অংশ হিসেবে ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠাচ্ছে। ফলে, পিসিই তীব্র পতনের মুখে পড়েছে। তাদের যুব শাখা (UJCE) এই সরকারি লাইন প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।আমেরিকার কমিউনিস্ট পার্টি (CPUSA) ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নির্বাচনী যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়, যারা বাইডেনকে ভোট দেওয়াকে ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ভোট’ হিসেবে প্রচার করে।দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টি ৩০ বছর ধরে পুঁজিবাদ-পন্থী এএনসি (ANC) সরকারের অংশ হয়ে আছে, এবং এমনকি তারা ২০১২ সালে মারিকানায় ৩৪ জন ধর্মঘটী খনি শ্রমিকের গণহত্যাকে সাফাই গেয়েছিল।এই তালিকা অন্তহীন।কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সংকটবিশ্ব ইতিহাসের এই সংকটময় মুহূর্তে, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন আজ সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় নিপতিত।বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো গাজায় গণহত্যার জবাবে ‘আন্তর্জাতিক আইন’ এবং জাতিসংঘের প্রস্তাবনা-অর্থাৎ, প্রকারান্তরে প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গের সিদ্ধান্ত ‘মেনে চলার’ আহ্বান জানিয়েই দায়িত্ব সেরেছে।কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনই একটি গভীর ফাটল বা বিভক্তি উসকে দিয়েছিল, যেখানে অধিকাংশ কমিউনিস্ট পার্টি লজ্জাজনকভাবে তাদের নিজ নিজ দেশের শাসক শ্রেণির অবস্থানের কাছে নতি স্বীকার করেছে।অনেক কমিউনিস্ট পার্টি, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের পার্টিগুলো, ন্যাটোর প্রতি তাদের পরোক্ষ সমর্থনকে ‘শান্তি’, ‘আলোচনা’ ইত্যাদির শান্তিবাদী আবেদনের আড়ালে ঢেকে রেখেছে। ইসরায়েল কর্তৃক গাজায় চালানো আগ্রাসন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে।উদাহরণস্বরূপ, ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি (PCF) বাম নির্বাচনী জোট (NUPES) থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে, কারণ এর নেতা মেলেনশন হামাসকে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে অস্বীকার করেছিলেন।অন্যদিকে আরেক চরম প্রান্তে, কিছু পার্টি রাশিয়া এবং চীনের পররাষ্ট্রনীতির নিছক ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। তারা এই শক্তিগুলোকে দুর্বল ও নির্ভরশীল জাতিগুলোর “সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশন এবং ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার” সংগ্রামের ‘প্রগতিশীল মিত্র’ হিসেবে তুলে ধরছে।রাশিয়ান ফেডারেশনের কমিউনিস্ট পার্টি (CPRF) হলো এর একটি চরম দৃষ্টান্ত। কমিউনিস্ট হওয়া তো দূরের কথা, একটি স্বাধীন দল হিসেবে টিকে থাকার দাবিও তারা হারিয়ে ফেলেছে। জুগানোভের পার্টি বহু আগেই পুতিনের প্রতিক্রিয়াশীল জমানার নিছক এক ‘লেজুড়’ বা অনুগামীতে পরিণত হয়েছে।এই স্ববিরোধিতাগুলো একের পর এক ভাঙনের জন্ম দিয়েছে। ২০২৩ সালে হাভানায় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টিগুলোর আন্তর্জাতিক সভায় (IMCWP) ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে একটি যৌথ বিবৃতি পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ তারা কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।কমিউনিস্ট আন্দোলনে সংকট এবং কেকেই (KKE)-এর ভূমিকাঅনেক সাধারণ কমিউনিস্ট কর্মীরাই এই নির্লজ্জ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।গ্রিক কমিউনিস্ট পার্টি (কেকেই) সন্দেহাতীতভাবে সেই পুরনো এবং বাতিল হয়ে যাওয়া ‘দুই স্তরের বিপ্লবের’ স্তালিনবাদী-মেনশেভিক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নে তারা একটি সঠিক আন্তর্জাতিকতাবাদী অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং এই যুদ্ধকে ‘আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী সংঘাত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।গ্রিক বন্দরগুলো থেকে ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর বিরুদ্ধে তারা শ্রমিকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। সমস্ত প্রকৃত কমিউনিস্টরা একে স্বাগত জানাবে। তবে, যদিও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবুও গ্রিক কমিউনিস্টরা তাদের অগ্রগতির পথ সম্পূর্ণ করে ফেলেছে—এমন সিদ্ধান্তে আসাটা এখনো বড্ড তড়িঘড়ি হয়ে যাবে।বিশেষ করে, ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’-এর মার্কসবাদ বিরোধী তত্ত্বের সাথে পুরোপুরি সম্পর্কচ্ছেদ করা এবং লেনিনীয় ‘যুক্তফ্রন্ট’ কৌশল গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।কেকেই (KKE) সেই সব কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে যারা ইউক্রেন যুদ্ধকে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী সংঘাত হিসেবে মনে করে। এটি সঠিক অভিমুখেই একটি পদক্ষেপ। তবে, সাফল্যের পূর্বশর্ত হলো বিশ্বের সমস্ত প্রকৃত কমিউনিস্ট ধারা বা প্রবণতাকে যুক্ত করে একটি খোলা এবং গণতান্ত্রিক বিতর্ক শুরু করা।বিতর্ক এবং ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র বদলে কূটনীতি এবং তথাকথিত ‘ঐকমত্যের’ ভিত্তিতে লেনিনের মতাদর্শ ও পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়ে একটি প্রকৃত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন করা অসম্ভব।আন্দোলনকে তার প্রকৃত উৎসে ফিরিয়ে আনা, কাপুরুষোচিত সংশোধনবাদের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলা এবং লেনিনের পতাকাকে বুকে তুলে নেওয়াই আমাদের কাজ। এই লক্ষ্যে, যারা এই একই উদ্দেশ্য ধারণ করে, এমন যেকোনো পার্টি বা সংগঠনের প্রতি আমরা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি।ট্রটস্কি যখন ‘ইন্টারন্যাশনাল লেফট অপজিশন’(International Left Opposition) বা আন্তর্জাতিক বাম বিরোধীপক্ষ গঠন করেছিলেন, তখন তিনি এটিকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনেরই একটি বাম বিরোধী অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। আমরা হলাম প্রকৃত কমিউনিস্ট বলশেভিক-লেনিনবাদী যাদের স্তালিন আমলাতান্ত্রিকভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সারি থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।অক্টোবরের লাল পতাকা এবং প্রকৃত লেনিনবাদকে সমুন্নত রাখার জন্য আমরা সর্বদা লড়াই করেছি, এবং এখন বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আমাদের ন্যায্য স্থান আমাদের পুনরুদ্ধার করতেই হবে।সময় এসেছে আন্দোলনের অভ্যন্তরে অতীত নিয়ে একটি সৎ আলোচনা শুরু করার, যা স্তালিনবাদের শেষ অবশেষটুকু ঝেড়ে ফেলবে এবং লেনিনবাদের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘস্থায়ী কমিউনিস্ট ঐক্যের পথ প্রস্তুত করবে।সংশোধনবাদ নিপাত যাক!সমস্ত কমিউনিস্টদের লড়াকু ঐক্যের জয় হোক!লেনিনের পথে ফিরে চলো!লেনিনের নীতিআমাদের আশু কাজ জনগণকে জয় করা নয়। এটি বর্তমানে আমাদের সামর্থ্যের পুরোপুরি বাইরে। আমাদের লক্ষ্য হলো শ্রমিক শ্রেণির সবচেয়ে অগ্রসর এবং শ্রেণি-সচেতন অংশটিকে জয় করা। কেবল এভাবেই আমরা জনগণের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা খুঁজে পাব। কিন্তু জনগণের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে হালকাভাবে নিলে চলবে না।শ্রমিক ও যুবকদের নতুন প্রজন্ম এই অচলবস্থা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে। তাদের সেরা অংশটি বুঝে গেছে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ ধরাই একমাত্র সমাধান।তারা তাদের সামনে থাকা সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে শুরু করেছে এবং ধীরে ধীরে আমূল সমাধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। কিন্তু তাদের অধৈর্যতা তাদের ভুলের দিকে নিয়ে যেতে পারে।কমিউনিস্টদের কাজ খুব সহজ হতো যদি কেবল বিপ্লবী স্লোগান দিয়ে শ্রমিক শ্রেণিকে জর্জরিত করলেই চলত। কিন্তু তা পুরোপুরি অপর্যাপ্ত এবং এমনকি হিতে বিপরীতও হতে পারে।শ্রমিক শ্রেণি কেবল অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শিখতে পারে, বিশেষ করে বিশাল সব ঘটনাপ্রবাহের অভিজ্ঞতা থেকে। সাধারণত তারা ধীরগতিতে শেখে—অনেক বিপ্লবীদের জন্য তা বড্ড বেশি ধীরগতির, যারা মাঝেমধ্যে অধৈর্য ও হতাশার কবলে পড়েন।লেনিন বুঝেছিলেন যে, বলশেভিকরা ক্ষমতা দখলের আগে তাদের প্রথমে জনগণকে জয় করতে হবে। এর জন্য কৌশলের ক্ষেত্রে চরম নমনীয়তা প্রয়োজন। লেনিন সবসময় বিপ্লবীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিতেন: ১৯১৭ সালের বিপ্লবের উত্তাল সময়েও বলশেভিকদের প্রতি তাঁর পরামর্শ ছিল—“ধৈর্য ধরে ব্যাখ্যা করো”।শ্রমিক শ্রেণির মূর্ত অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে সঠিক কৌশল আয়ত্ত করা ছাড়া বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার সমস্ত কথাবার্তা নিছক ‘ফাঁকা বুলি’ মাত্র: এটি যেন ফলাহীন এক ছুরি।একারণেই কমিউনিস্টদের চিন্তাভাবনায় ‘রণনীতি ও রণকৌশলের’ প্রশ্নটি অবশ্যই কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে থাকবে। গণ-সংস্কারবাদী সংগঠনগুলোর সাথে কমিউনিস্ট অগ্রবাহিনীর সম্পর্ক কেমন হবে, সে সম্পর্কে লেনিন ও ট্রটস্কি উভয়েরই অত্যন্ত স্বচ্ছ ধারণা ছিল।এটি লেনিনের বিপ্লবী কৌশলের ওপর নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত বা শ্রেষ্ঠ দলিলটিতে সারসংক্ষেপ করা হয়েছে: ‘বামপন্থী কমিউনিজম: এক শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা’ (Left-wing Communism, an Infantile Disorder)। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লেনিনের লেখাগুলো ছদ্ম-ট্রটস্কিবাদী সংকীর্ণতাকামীদের কাছে আজও ‘সাত তালাবদ্ধ বই’-এর মতোই দুর্বোধ্য রয়ে গেছে।তারা সর্বত্র ট্রটস্কিবাদের পতাকাকে কলঙ্কিত করেছে এবং আমলাতন্ত্রের প্রতি ‘অমূল্য সেবা’ প্রদান করেছে। তারা মনে করে যে গণসংগঠনগুলোকে কেবল ঐতিহাসিকভাবে সেকেলে বা অচল বলে বাতিল করে দেওয়া যায়। এই সংগঠনগুলোর প্রতি তাদের মনোভাব কেবল ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র তীব্র নিন্দাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই কৌশলগুলো সোজা এক কানাগলির দিকে নিয়ে যায়।লেনিন ও ট্রটস্কির নমনীয় পদ্ধতির সাথে এদের কোনো মিল নেই, যারা বুঝেছিলেন যে সংস্কারবাদীদের প্রভাবাধীনে থাকা বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের সাথে সেতুবন্ধন রচনা করা কমিউনিস্টদের জন্য অপরিহার্য।আমাদের অবশ্যই এই ‘বন্ধ্যা সংকীর্ণতাবাদের’ দিকে দৃঢ়ভাবে পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়াতে হবে এবং সাহসের সাথে শ্রমিক শ্রেণির মুখোমুখি হতে হবে। জনগণের কাছে ধৈর্য ধরে কমিউনিস্ট নীতি ব্যাখ্যা করে এবং সংস্কারবাদী নেতাদের কাছে দাবি উত্থাপন করার মাধ্যমে সংস্কারবাদী শ্রমিকদের কমিউনিজমের পথে জয় করে আনা সম্ভব।“সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে”১৯১৭ সালে লেনিন যখন “সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে” স্লোগানটি তুলেছিলেন, তখন এই সংগঠনগুলো, যা শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতিনিধিত্ব করত, সংস্কারবাদী ‘মেনশেভিক’ এবং ‘সোশ্যাল রিভলিউনারি’দের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যটি উল্লেখ করাই যথেষ্ট।এই স্লোগানের মাধ্যমে লেনিন সোভিয়েতের সংস্কারবাদী নেতাদের বলছিলেন: “বেশ তো, ভদ্রমহোদয়গণ। আপনাদের তো সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। আমরা প্রস্তাব করছি যে আপনারা ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিন এবং জনগণকে তা-ই দিন যা তারা চায়—শান্তি, রুটি এবং জমি। আপনারা যদি এটা করেন, তবে আমরা আপনাদের সমর্থন দেব, গৃহযুদ্ধ এড়ানো যাবে, এবং ক্ষমতার সংগ্রামটি সোভিয়েতের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তারের একটি শান্তিপূর্ণ সংগ্রামে পর্যবসিত হবে।”কাপুরুষ সংস্কারবাদী নেতাদের ক্ষমতা দখলের কোনো ইচ্ছাই ছিল না। তারা নিজেদের বুর্জোয়া ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের’ পদানত করেছিল, যারা আবার নিজেরা ছিল সাম্রাজ্যবাদ এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পদানত। এর ফলে সোভিয়েতের শ্রমিক এবং সৈনিকরা তাদের নেতাদের বিশ্বাসঘাতক স্বরূপটি নিজের চোখে দেখতে পেল এবং বলশেভিজমের দিকে ঝুঁকে পড়ল।কেবল এই উপায়েই বলশেভিকদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ৮,০০০ সদস্যের একটি ছোট পার্টি থেকে এমন এক গণশক্তিতে রূপান্তরিত হওয়া, যা অক্টোবর বিপ্লবের ঠিক আগে সোভিয়েতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল।সর্বোপরি, আজ আমাদের বাস্তবতাবোধ বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন। আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ঐতিহাসিক শক্তিগুলো কমিউনিজমের প্রকৃত শক্তিকে অনেক পেছনে ঠেলে দিয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনে আমরা আজ ‘সংখ্যালঘুর মধ্যেও সংখ্যালঘু’ হয়ে পড়েছি।আমাদের ধারণাগুলো সঠিক, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির বিশাল অংশকে এখনো এটা বোঝানো বাকি আছে যে আমাদের ধারণাগুলো সঠিক এবং প্রয়োজনীয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা প্রথাগত সংস্কারবাদী সংগঠনগুলোর প্রভাবাধীনে রয়ে গেছে, তার সহজ কারণ হলো ওই সংগঠনগুলোর নেতারা তাদের সংকটের এমন একটি সমাধানের পথ দেখায় যা আপাতদৃষ্টিতে সহজ এবং যন্ত্রণাহীন বলে মনে হয়।বাস্তবে, এই পথ কেবল আরও পরাজয়, হতাশা এবং দুর্দশার দিকেই নিয়ে যায়। সংস্কারবাদী শ্রেণি-বিশ্বাসঘাতক এবং আমলাদের দয়ার ওপর শ্রমিক শ্রেণিকে ছেড়ে দেওয়া কমিউনিস্টদের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। বরং, আমাদের তাদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন সংগ্রাম চালাতে হবে। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণি ‘সংস্কারবাদের যন্ত্রণাদায়ক পাঠশালার’ মধ্য দিয়ে না গিয়ে কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না।আমাদের কাজ সাইডলাইন বা পাশ থেকে তাদের দিকে কেবল টিপ্পনি কাটা নয়, বরং ১৯১৭ সালে বলশেভিকরা যেমনটি করেছিল ঠিক তেমনি তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া, তাদের শিক্ষা গ্রহণে সাহায্য করা এবং সামনের পথ খুঁজে বের করা।শ্রমিকদের সাথে সেতুবন্ধন গড়ো!আমাদের অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণির সাথে একটি সংলাপ বা কথোপকথন স্থাপন করতে হবে, যেখানে আমাদের ‘বিজাতীয় উপাদান’ বা শত্রু হিসেবে দেখা হবে না, বরং সাধারণ শত্রু, পুঁজির, বিরুদ্ধে সংগ্রামের ‘কমরেড’ বা সহযোদ্ধা হিসেবে দেখা হবে। আমাদের কথার মাধ্যমে নয়, বরং কাজের মাধ্যমেই তাদের কাছে কমিউনিজমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে।সংস্কারবাদের প্রভাবাধীনে থাকা বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কাছে পৌঁছানোর উপায় ও পন্থা আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে। সাধারণ শ্রমিকদের কাছ থেকে কমিউনিস্টদের বিচ্ছিন্ন করার জন্য আমলাতন্ত্র প্রতিটি অসাধু পদ্ধতি ব্যবহার করবে। নিষেধাজ্ঞা, বর্জন, বহিষ্কার, মিথ্যাচার, কুৎসা, অপমান এবং সব ধরণের আক্রমণ তারা চালাবে। কিন্তু এই বাধাগুলো অতিক্রম করার উপায় ও পন্থা কমিউনিস্টরা সবসময়ই খুঁজে বের করবে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব জবরদখলকারী আমলাতন্ত্রের এমন কোনো সাধ্য নেই যে তারা কমিউনিস্টদের শ্রমিক শ্রেণির কাছে পৌঁছাতে বাধা দিতে পারে।রণকৌশল নির্ধারণের কোনো ‘স্বর্ণসূত্র’ বা ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, তা নির্ধারিত হয় মূর্ত পরিস্থিতির দ্বারা। এটি কোনো নীতিগত প্রশ্ন নয়, বরং একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন। কৌশলের প্রশ্নে লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই ছিল নমনীয়। সেই একই লেনিন যিনি ১৯১৪ সালে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি থেকে বিচ্ছেদের পক্ষে আপসহীন ছিলেন এবং ব্রিটেনে একটি স্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার সমর্থন করেছিলেন, তিনিই আবার প্রস্তাব করেছিলেন যে ব্রিটিশ পার্টি যেন লেবার পার্টির সাথে যুক্ত হওয়ার আবেদন করে, তবে অবশ্যই নিজস্ব কর্মসূচি, পতাকা এবং নীতি বজায় রেখে।বিশেষ পরিস্থিতিতে, বামমুখী শ্রমিকদের একটি দৃঢ় বিপ্লবী অবস্থানে জয় করে আনার জন্য আমাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে সংস্কারবাদী সংগঠনগুলোর ভেতরে প্রবেশ করার প্রয়োজন হতে পারে।তবে বর্তমান পর্যায়ে বিষয়টি এমন নয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি এখন অনুপস্থিত। কিন্তু সবসময়ই শ্রমিক শ্রেণির কাছে যাওয়ার একটি রাস্তা খুঁজে বের করা অপরিহার্য। এটি কোনো কৌশলের প্রশ্ন নয়, বরং কমিউনিস্ট অগ্রবাহিনীর জন্য এটি জীবন-মরণের প্রশ্ন।এমনকি একটি স্বাধীন পার্টি হিসেবে কাজ করার সময়েও, কমিউনিস্টরা শ্রমিক শ্রেণির গণসংগঠনগুলোর দিকে মুখ করে দাঁড়াতে দায়বদ্ধ। জনগণের কাছে যাওয়ার পথ খুঁজে পেতে যেখানেই সম্ভব ‘যুক্তফ্রন্ট কৌশল’ প্রয়োগ করতে হবে। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন এবং ট্রটস্কির মতাদর্শ ও পদ্ধতির সাথে যার সামান্যতম পরিচয়ও আছে, তার কাছে এটাই হলো প্রাথমিক পাঠ।আমাদের নীতি হুবহু লেনিনের পরামর্শ এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম চারটি কংগ্রেসের থিসিস বা সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে রচিত। আমাদের সংকীর্ণতাবাদী সমালোচকরা যদি এটা না বোঝেন, তবে সেটা একান্তই তাদের দুর্ভাগ্য।আমরা কিসের জন্য লড়ছি?সারমর্মে, কমিউনিস্টদের লক্ষ্য এবং সাধারণ শ্রমিকদের লক্ষ্য একই। আমরা ক্ষুধা ও গৃহহীনতার সম্পূর্ণ নির্মূল চাই; আমরা চাই উন্নত পরিবেশে নিশ্চিত কর্মসংস্থান; আমরা চাই কর্মসপ্তাহ বা খাটুনির সময় আমূল হ্রাস এবং অবসর সময়ের অধিকার অর্জন; আমরা চাই সবার জন্য নিশ্চিত ও উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা; আমরা চাই সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধের অবসান; এবং আমাদের এই গ্রহের ওপর চলা উন্মাদপরায়ণ ধ্বংসযজ্ঞের সমাপ্তি।কিন্তু আমরা নির্দেশ করি যে, পুঁজিবাদী সংকটের এই পরিস্থিতিতে, এই লক্ষ্যগুলো কেবল এক ‘আপসহীন সংগ্রামের’ মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব, এবং এই সংগ্রাম চূড়ান্তভাবে তখনই সফল হতে পারে যখন তা ব্যাংকার এবং পুঁজিপতিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দিকে ধাবিত হয়। ঠিক এই কারণেই ট্রটস্কি ‘অন্তর্বর্তীকালীন দাবির’ ধারণাটি গড়ে তুলেছিলেন।শ্রমিক শ্রেণির প্রতিটি সংগ্রামে কমিউনিস্টরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে বা হস্তক্ষেপ করবে। আন্দোলনের সাথে সাথে কমিউনিস্টরা যে সুনির্দিষ্ট বা মূর্ত দাবিগুলো তুলবে, তা অবশ্যই পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে ঘন ঘন পরিবর্তিত হবে এবং প্রতিটি দেশের অবস্থা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হবে। তাই, এই প্রকৃতির একটি ইশতেহারে দাবিদাওয়ার কোনো ‘কর্মসূচিগত তালিকা’ দেওয়াটা বেমানান হবে।তবে, প্রতিটি দেশের কমিউনিস্টরা কীভাবে সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো তৈরি করবে, তার পদ্ধতিটি ১৯৩৮ সালে ট্রটস্কি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এটি প্রকাশিত হয়েছিল চতুর্থ আন্তর্জাতিকের ভিত্তি দলিলে, যার নাম ছিল ‘পুঁজিবাদের মরণ-যন্ত্রণা এবং চতুর্থ আন্তর্জাতিকের করণীয়’ (The Death Agony of Capitalism and the tasks of the Fourth International) বা যা সাধারণভাবে ‘ট্রানজিশনাল প্রোগ্রাম’ অথবা ‘অন্তর্বর্তীকালীন কর্মসূচি’ নামেই বেশি পরিচিত।ওই দলিলে উপস্থাপিত দাবিগুলো মূলত লেনিন এবং বলশেভিকদের তৈরি করা কর্মসূচিরই ‘সারসংকলন’ যা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম চারটি কংগ্রেসের প্রকাশিত থিসিস এবং দলিলগুলোতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।অন্তর্বর্তীকালীন দাবির মূল ধারণাটি খুব সহজেই বলা যায়। ট্রটস্কি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, পুঁজিবাদের অবক্ষয়ের যুগে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য যেকোনো সিরিয়াস সংগ্রাম অনিবার্যভাবে “পুঁজিবাদী সম্পত্তি সম্পর্ক এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে যাবে।”যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন ‘আত্মরক্ষামূলক লড়াই’একসময় ‘আক্রমণাত্মক লড়াইয়ে’ রূপান্তরিত হতে পারে, ঠিক তেমনি শ্রেণিসংগ্রামের ক্ষেত্রেও আশু দাবির লড়াই বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘চেতনার উল্লম্ফন’ ঘটাতে পারে এবং ক্ষমতার জন্য বিপ্লবী সংগ্রামের দিকে মোড় নিতে পারে।শেষ বিচারে, বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যের সাথে যুক্ত না হলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী রূপ পেতে পারে না।কমিউনিস্টরা শ্রমিক শ্রেণির সার্বিক মুক্তি এবং নিপীড়ন ও হাড়ভাঙা খাটুনির যন্ত্রণা থেকে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে। এটি কেবল তখনই অর্জন করা সম্ভব যখন বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা হবে, উৎপাদনের উপায়সমূহ বাজেয়াপ্ত করা হবে, এবং গণতান্ত্রিক শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার অধীনে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা চালু করা হবে।এর ওপরই নির্ভর করছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ। মহান আইরিশ মার্কসবাদী জেমস কনলির ভাষায়:“আমাদের দাবি অতি সামান্য, আমরা কেবল পৃথিবীটা চাই।”কমিউনিজম কি একটি ইউটোপীয় ধারণা?পুঁজিবাদের রক্ষকদের শেষ আশ্রয় হলো এটা বলা যে, তাদের এই দেউলিয়া ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কোনো বিবেকবান মানুষ কি এটা বিশ্বাস করতে পারে?এটা কি সত্যিই হতে পারে যে মানবজাতি বর্তমানের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির চেয়ে উন্নত কোনো ব্যবস্থা চিন্তা করতে অক্ষম? এমন একটি আজগুবি দাবি আমাদের প্রজাতির বুদ্ধিমত্তার ওপর এক জঘন্য অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।ব্যাংকার এবং পুঁজিপতিদের একনায়কত্ব উচ্ছেদ করা হলে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে যা মুষ্টিমেয় কিছু বিলিয়নেয়ারের সর্বগ্রাসী লোভ মেটানোর পরিবর্তে মানবজাতির প্রয়োজন মেটানোর জন্য যুক্তিপূর্ণভাবে পরিকল্পিত হবে।যেকোনো সিরিয়াস চিন্তাশীল মানুষের কাছেই এর সমাধানটি সুস্পষ্ট। এবং এটি এখন আমাদের হাতের নাগালেই। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, যুদ্ধ এবং পুঁজিবাদের অন্যান্য সমস্ত অভিশাপ দূর করার এবং মানুষের বসবাসের যোগ্য একটি পৃথিবী গড়ে তোলার এটাই একমাত্র পথ।কমিউনিজমের শত্রুরা যুক্তি দেখায় যে এটি একটি ইউটোপীয়। এই অভিযোগের মধ্যে এক ধরনের পরিহাস লুকিয়ে আছে। যা আসলে ইউটোপীয় বা অবাস্তব, তা হলো এমন একটি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা যা তার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলেছে, এবং যার অস্তিত্বই সমাজের প্রকৃত প্রয়োজনের সাথে চরম সাংঘর্ষিক। এমন ব্যবস্থার টিকে থাকার কোনো অধিকার নেই এবং ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়াই তার নিয়তি।কমিউনিজমের মধ্যে ইউটোপীয় কিছুই নেই। বরং উল্টোটা সত্য। একটি নতুন এবং উন্নততর মানব সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত শর্তাবলী ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান এবং তা দ্রুত পেকে উঠছে।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশাল অগ্রগতি আমাদের সামনে এমন এক পৃথিবীর আকর্ষণীয় ছবি তুলে ধরেছে যা দারিদ্র্য, গৃহহীনতা এবং ক্ষুধামুক্ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ এবং আধুনিক রোবোটিক্সের সমন্বয় কাজের সময় বা কর্মঘণ্টা এতটাই কমিয়ে আনতে পারে যে, শেষ পর্যন্ত মানুষকে আর কাজ করতে হবে না, যদি না সে নিজের ইচ্ছায় তা করতে চায়।শ্রমের দাসত্ব উচ্ছেদ করাই হলো শ্রেণিহীন সমাজের প্রকৃত বস্তুগত ভিত্তি। এটা এখন পুরোপুরি সম্ভব। এটি কোনো ইউটোপিয়া নয়, বরং এমন কিছু যা পুরোপুরি আমাদের আয়ত্তের মধ্যে। পুরনো সমাজের গর্ভেই নিঃশব্দে কিন্তু দৃঢ়ভাবে একটি নতুন পৃথিবী জন্ম নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বেড়ে উঠছে।কিন্তু পুঁজিবাদের অধীনে, সবকিছুই তার বিপরীতে রূপান্তরিত হয়। যে ব্যবস্থায় সবকিছুই মুনাফার উদ্দেশ্যের অধীন, সেখানে প্রতিটি নতুন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানেই বেকারত্ব বৃদ্ধি, সেই সাথে কর্মঘণ্টার দীর্ঘসূত্রতা এবং শোষণ ও দাসত্বের বৃদ্ধি।আমরা যা প্রস্তাব করছি তা হলো মুষ্টিমেয় কয়েজনের অসীম লোভের কাছে জিম্মি থাকা এই অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যবস্থাটিকে হটিয়ে তার জায়গায় মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য উৎপাদনভিত্তিক একটি যুক্তিপূর্ণ ও সুষম পরিকল্পিত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।একটি প্রকৃত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের জন্য!তিন দশক আগে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা বিজয়ের সুরে ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস এত সহজে ঝেড়ে ফেলা যায় না। বুর্জোয়া কলমচিদের মতামত উপেক্ষা করে তা নিজের পথে চলতে থাকে। এবং এখন ইতিহাসের চাকা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন নিঃসন্দেহে একটি বড় ঐতিহাসিক নাটক ছিল। কিন্তু পেছনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এটি ছিল আরও বড় এক নাটকের—পুঁজিবাদের অন্তিম সংকটের—মাত্র একটি পূর্বাভাষ বা ভূমিকা।উপরে বর্ণিত কারণগুলোর জন্য, বর্তমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী প্রকৃতির হবে। আত্মগত উপাদানের অনুপস্থিতির কারণে, উত্থান-পতন সহ এটি বছর বা এমনকি দশক ধরে চলতে পারে। তবে, এটি মুদ্রার মাত্র একটি পিঠ।সংকট দীর্ঘায়িত হবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তা শান্তিপূর্ণ ও ধীরস্থির হবে। বরং ঠিক উল্টো! আমরা আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল এবং বিশৃঙ্খল সময়ে প্রবেশ করেছি।সংকট একের পর এক দেশকে গ্রাস করবে। শ্রমিক শ্রেণি ক্ষমতা দখলের বহু সুযোগ পাবে। পুরো পরিস্থিতির মধ্যেই তীব্র এবং আকস্মিক পরিবর্তন নিহিত রয়েছে। যখন আমরা সবচেয়ে কম আশা করব, তখনই তা বিস্ফোরিত হতে পারে। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।কমিউনিজমের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে যুবকদের বিশাল অংশকে বোঝানোর আর প্রয়োজন নেই। তারা ইতিমধ্যেই কমিউনিস্ট। তারা খুঁজছে একটি কলঙ্কহীন পতাকা, এমন একটি সংগঠন যা সংস্কারবাদ এবং কাপুরুষোচিত ‘বাম’ সুবিধাবাদের সাথে আমূল বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।তাদের খুঁজে বের করতে এবং দলে ভেড়াতে আমাদের সম্ভাব্য সব ব্যবহারিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে একটি নতুন পার্টি এবং একটি নতুন আন্তর্জাতিক ঘোষণা করা। সামগ্রিক পরিস্থিতি এটাই দাবি করছে। এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং জরুরি কাজ যা আর বিলম্ব সয় না।যা প্রয়োজন তা হলো একটি প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি, যা লেনিন এবং অন্যান্য মহান মার্কসবাদী শিক্ষকদের মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে, এবং এমন একটি আন্তর্জাতিক যা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম পাঁচ বছরের আদলে গঠিত হবে।আমাদের সামনে যে বিশাল কাজ রয়েছে তার তুলনায় আমাদের সংখ্যা এখনো নগণ্য এবং এ বিষয়ে আমাদের কোনো মোহ নেই। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি বিপ্লবী আন্দোলন সবসময়ই শুরু হয়েছে একটি ছোট এবং আপাতদৃষ্টিতে নগণ্য উপাদান হিসেবে।আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার আছে, এবং সেই কাজ ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ফল দিতে শুরু করেছে এবং একটি নির্ণায়ক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।আমরা দ্রুত বড় হচ্ছি কারণ আমরা এখন ইতিহাসের স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটছি। সর্বোপরি, আমাদের কাছে সঠিক মতাদর্শ আছে। লেনিন বলেছিলেন, মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান কারণ তা সত্য। এই সত্য ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাসে পূর্ণ করে তোলে।মহান ফরাসি ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রী ফুরিয়ার সমাজতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন মানবজাতির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ হিসেবে।কমিউনিজমের অধীনে, মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, সংস্কৃতির জগতকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করার জন্য জনগণের সামনে দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে-যা এতদিন তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। শিল্প, সঙ্গীত এবং সংস্কৃতির এমন এক অভাবনীয় বিকাশের পথ উন্মুক্ত হবে, যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি।একটি নতুন পৃথিবীর জন্য, যেখানে জীবন এক সম্পূর্ণ নতুন অর্থ পাবে। এবং প্রথমবারের মতো, নারী ও পুরুষরা পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে নিজেদের প্রকৃত উচ্চতায় উন্নীত হতে পারবে। এটি হবে আবশ্যিকতার জগত থেকে স্বাধীনতার জগতে মানবজাতির উল্লম্ফন।মৃত্যুর পর একটি উন্নত জীবনের আশায় নারী ও পুরুষদের আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। তারা একটি নতুন পৃথিবীর অভিজ্ঞতা লাভ করবে, যেখানে খোদ জীবনটাই—নিপীড়ন, শোষণ এবং অবিচার থেকে মুক্ত হয়ে—এক সম্পূর্ণ নতুন অর্থ খুঁজে পাবে।এটাই সেই চমৎকার বিষয় যার জন্য আমরা লড়াই করছি: এই পৃথিবীতেই একটি স্বর্গ।প্রকৃত কমিউনিজম মানে এটাই।এটাই একমাত্র উদ্দেশ্য যার জন্য লড়াই করা সার্থক।একারণেই আমরা কমিউনিস্ট!আমাদের প্রত্যেকের ওপরই এই দায়িত্ব বর্তায় যে, আমরা যেন নিশ্চিত করি এই কাজটি অবিলম্বে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই এবং আমরা সফল হবোই—এই পরম প্রত্যয়ের সাথে সম্পন্ন করা হয়।আমাদের লড়াকু স্লোগান হোক: সাম্রাজ্যবাদী লুটেরারা নিপাত যাক! পুঁজিবাদী দাসত্ব নিপাত যাক! ব্যাংকার এবং পুঁজিপতিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করো! কমিউনিজম দীর্ঘজীবী হোক! দুনিয়ার মজদুর, এক হও! একটি নতুন আন্তর্জাতিক গড়ার লক্ষে এগিয়ে চলো!